জেলা প্রতিনিধি
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র রূপ ধারণ করেছে। ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও খেদাইমারী গ্রামে গত এক সপ্তাহেই নদী ভাঙনে বিলিন হয়েছে ১৭টি পরিবারের ভিটেমাটি। বসতবাড়ির পাশাপাশি নদীগর্ভে চলে গেছে বিঘার পর বিঘা কাঁচা-পাকা আমন ধান, ভুট্টা ক্ষেতসহ শাকসবজি। ভাঙন এতটাই তীব্ররুপ ধারণ করেছে যে, একদিকে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে, অপরদিকে পাড়ের কাছে ঝুঁকির মধ্যে রোপন করা কাচাপাকা ধান কাটছে কৃষকা। এমন ধান কেটে ঘরে তোলার ধারণকৃত ভীতিকর ও বিপজ্জনক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত মাত্র এক বছরেই এই একই এলাকায় প্রায় সাড়ে ৫ শতাধিক পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে ৬/৭ মাস পূর্বে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেললেও সঠিক তদারকি ও স্থায়ী ব্যবস্থার অভাবে সেগুলোও এখন নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে নদীর পাড় কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
চর শৌলমারী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের (সুখেরবাতি এলাকা) ইউপি সদস্য (মেম্বার) আনছার আলী তুহিন জানান, গত এক সপ্তাহে তার নিজস্ব ওয়ার্ডে ৭টি এবং পার্শ্ববর্তী ৮নং ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে ১০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে।
ভাঙনে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে সুখেরবাতি এলাকার বাসিন্দা মৃত জুরান শেখের ছেলে দেলোয়ার, মৃত নওশাদের ছেলে নজরুল ইসলাম, বাবু পাগলার ছেলে রুপচান, আশেক আলীর মেয়ে আয়শা খাতুন, মৃত বুলু শেখের ছেলে ছোবহান এবং গোলাপ ঠাকুরের ছেলে লালু শেখের বাড়ি রয়েছে।
অন্যদিকে, ৮নং ওয়ার্ডে ঘরবাড়ি হারানো বাসিন্দারা হলেন— মৃত বুলা বয়াতির ছেলে কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, হাতেম, কদম আলী, কোরবান আলীর ছেলে আব্দুল খালেক, পিয়ার আলীর ছেলে মহর উদ্দিন, আব্দুস ছপুরের ছেলে সিরাজুল, মৃত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলী এবং সোলায়মানের ছেলে আক্কাস আলী। এ ছাড়া চরে নতুন বাড়ি করা আরও দুই ব্যক্তির বসতভিটাও নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে, যাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বসতবাড়ির পাশাপাশি নদী ভাঙনের গ্রাসে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুখেরবাতি চরে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে কৃষকদের নিরুপায় হয়ে কাঁচা ধান কাটার কিছু ছবি ভাইরাল হয়।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, ওই এলাকার মৃত মহেজ মোল্লার ছেলে ইউনুছ মোল্লার নদীর তীরবর্তী দেড় বিঘা আমন ধানের জমির পুরোটাই নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এ ছাড়া মৃত ওসমান প্রামাণিকের ছেলে ছবুর প্রামাণিকের ৪ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা আমন ক্ষেত নদীতে চলে গেছে। একই সঙ্গে ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলীর বাড়িভিটাসহ ৩ বিঘা ধানি জমিও নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে।
হঠাৎ করে ভাঙন তীব্র হওয়ায় চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নিঃস্ব পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে ও অন্যের জমিতে আশ্রয় নিচ্ছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্রুত ও স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
মোবাইল ফোনে জমসের আলী জানান, ‘আমাগো বাড়িভিটাসহ ৩ বিঘা জমি নদীতে গেছে। অহন আমি কি করুম! ধারদেনা করি মানুষের জমিতে ঘর উঠাইছি। সরকারি-বেসরকারিভাবে কেউ সহযোগিতা করে নাই।’
এ বিষয়ে চর শৌলমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান জানান, আমার সুখেরবাতি, খেদাইমারী ও সোনাপুর ওয়ার্ড তিনটিতে নদী ভাঙন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। এখানে ব্লকের কাজ না করায় জিও ব্যাগ দিয়ে ব্রহ্মপূত্র নদের ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যা জিও ব্যাগ ফেলানো হয়েছে, সেগুলো নদী গর্ভে চলে গেছে। এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে নদী। ফলে দ্রুত আবাদিজমি, গাছপালা ও বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। আগে সরকারিভাবে ভাঙন কবলিতদের আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করা হলেও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অসহায় গরিব মানুষের জন্য নতুন করে মাথা গোঁজা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জরুরি কাজের জন্য এখন কোন বাজেট বরাদ্দ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছেন।
প্রতিনিধি/এলএ