জেলা প্রতিনিধি
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেছেন, ফকির লালন শাহের গান, গীতিকবিতা ও জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারলেই লালন উৎসবের আয়োজন সার্থক হবে। মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা, ধনী-গরিব কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর্শনেরভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করাই লালনের দর্শনের প্রকৃত শিক্ষা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায় ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমির আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সংগীত অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফকির লালন শাহ ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি মানবপ্রেমে বিশ্বাস করতেন এবং অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শন ধারণ করতেন। জাতপাতের ভেদাভেদ তিনি অস্বীকার করেছিলেন। অথচ তার সময়ে সমাজ জাতপাত ও ধনী-গরিবের বিভাজনে চূড়ান্তভাবে বিভক্ত ছিল।
লালনের জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের ভিন্ন ভিন্ন মতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ তার জন্মস্থান কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়, কেউ বৃহত্তর যশোরের হরিশপুরে, আবার কেউ ফুলবাড়িতে বলে উল্লেখ করেন। তবে জন্মস্থান নিয়ে বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- লালন এই অঞ্চলের এবং এই দেশের মানুষ।
বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতির বিকাশে পীর-মাশায়েখ, বুজুর্গ, ফকির ও দরবেশদের জীবনদর্শনের অবদানের কথা তুলে ধরে অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, তাদের দর্শন এ দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এ অঞ্চলের মানুষ তাদের দেখানো পথে মুক্তির সন্ধান করেছেন, আবার অনেকে এসব সাধকের জীবনদর্শন থেকে আত্মার শান্তি খুঁজেছেন। ফকির লালন শাহ ও পাগলা কানাই তাদের মধ্যে অন্যতম।
লালনচর্চার প্রকৃত সার্থকতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর লালন উৎসবে অংশ নেওয়া কিংবা সারা বছর তার গান ও গীতিকবিতাকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। লালনের দর্শন যদি আমাদের জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে এসব আয়োজনে অংশগ্রহণ নিরর্থক হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, প্রকৃত শিক্ষা তখনই সার্থক হয়, যখন জানা বিষয়টি মানুষের জীবনযাপনকে স্পর্শ করে এবং তাকে আগের অবস্থান থেকে পরিবর্তিত করে। লালনের গান, গীতিকবিতা ও জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে ও সম্মান করতে শেখাই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীরও শিক্ষা হওয়া উচিত মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখা। ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক দর্শন কিংবা আর্থিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের হুংকার ও জীবনহানির আয়োজন দেখা যাচ্ছে। এর অনিবার্য পরিণতি ধ্বংস, অশান্তি ও বিপর্যয়। এ পরিস্থিতিতে লালনের মানবতাবাদী দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসতে হবে এবং হৃদয়ের উদারতা দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। নিজেদের ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতা পরিহার করে সমাজে বিদ্যমান বিভেদের রেখা মুছে ফেলতে পারলেই লালনের দর্শনের প্রকৃত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এই শিক্ষা নিয়েই সবাইকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদ বিন হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন- কুষ্টিয়া-৪ এর সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ, সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. মো. খালেদুজ্জামান।
এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লালনভক্ত, গবেষক, সুধীজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন ।
প্রতিনিধি/এলএ