Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

টাঙ্গাইলে একই উঠানে মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

জেলা প্রতিনিধি

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের চৌধুরী বাড়িতে একই প্রাঙ্গণে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন, অন্যদিকে মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায়। দুই ধর্মের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের এই চিত্র স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এখানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বজায় রয়েছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯৬২ সালে একই প্রাঙ্গণে নির্মিত হয় চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সীমানাপ্রাচীরের পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ প্রান্তে মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থাও রয়েছে।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বর্তমানে মন্দির প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ঢাকের শব্দ, আলোকসজ্জা ও ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর পরিবেশের মধ্যেও মসজিদে আজানের সময় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয় বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এই রীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রাঙ্গণে মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরে এবং মুসলমানরা মসজিদে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করছেন। এ পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়েই এই সম্প্রীতি বজায় রয়েছে।

04b7264e-8098-42ae-a4dc-197940f134fb

পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে পালনে স্থানীয় মুসলমানেরা সহযোগিতা করেন। নাগরপুরের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের কাছেও সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে উঠুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে মির্জাপুর উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৭০টি এবং দেলদুয়ার উপজেলায় সর্বনিম্ন ৩৪টি মণ্ডপ রয়েছে। একই প্রাঙ্গণে মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বনিক বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধারণ করে আসছে। নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ি তার একটি উদাহরণ। একই প্রাঙ্গণে মুসলমানেরা নামাজ আদায় করছেন, আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদ্‌যাপন করছেন। আগের বছরগুলোর মতো এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদ্‌যাপিত হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে জেলাজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে দুই ধর্মের মানুষের সহাবস্থান সম্প্রীতির অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তবে জেলার সব পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।

টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, ‘এই মাটিতে “সংখ্যালঘু” বলে কোনো শব্দ নেই, আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন—এটাই আমাদের ঐতিহ্য। একই আঙিনায় পূজা-অর্চনা ও নামাজ আদায় হচ্ছে, যা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ তৎপর রয়েছেন।’

প্রতিনিধি/এসএস