জেলা প্রতিনিধি
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম
জন্মের মাত্র ১০ মাস বয়সে অসুস্থতায় অবশ হয়ে যায় ডান হাত ও পা। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করিয়েও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি শরীর। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার চলার পথকে কঠিন করে তুললেও দমাতে পারেনি জ্ঞান অর্জনের অদম্য ইচ্ছা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা চালিয়ে মাওলানা পাস করেছেন স্থানীয় লিমন হাসান রাহাদ (২৭)। এবার তার স্বপ্ন মুফতি হওয়া। তবে আর্থিক সংকটে থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল সেই স্বপ্ন। এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুর জেলা পরিষদের অনুদানের চেক নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে রাহাতকে।
রাহাতের পরিবার জানায়, লিমন হাসান রাহাত এক বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে মেজ। তার বাবা আবুল কালাম আজাদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে চাকরি করেন। মা তাছলিমা খানম লাকি গৃহিণী। পরিবারের সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছেন বাবা-মা।
পরিবারের স্বপ্ন ছিল, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যেন রাহাতের শিক্ষাজীবনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ছোটোবেলা থেকেই মেধাবী রাহাতকে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। এরপর নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন পরিবারের সদস্যরা। নিরাপত্তা প্রহরীর স্বল্প আয়ের মধ্যেও ছেলের শিক্ষার ব্যয় বহন করে গেছেন বাবা আবুল কালাম আজাদ।
সেই প্রচেষ্টার ফলও পেয়েছেন তারা। গত বছর মাওলানা পাস করেছেন রাহাত। এরপর মুফতি শ্রেণিতে পড়াশোনার মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষায় আরও উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে মুফতি শ্রেণিতে ভর্তিও হয়েছেন। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, বই ও কিতাব কেনার সামর্থ্য না থাকায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন রাহাত ও তার পরিবার।
একদিকে ছেলের উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার স্বপ্ন, অন্যদিকে সংসারের সীমিত আয় দুইয়ের টানাপড়েনে দিশাহারা হয়ে পড়েন বাবা-মা। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় বই ও কিতাবের অভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে উঠছিল। যে স্বপ্ন পূরণে বছরের পর বছর সংগ্রাম করেছেন পরিবার, তা যেন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে এসে থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
ঠিক এমন সময় গাজীপুর জেলা পরিষদের অনুদানের চেক রাহাতের জীবনে নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে এসেছে। এই আর্থিক সহায়তা তার শিক্ষাসামগ্রী কেনা এবং মুফতি হওয়ার স্বপ্ন এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রতিকূলতার পর এই সহায়তা তার পরিবারেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
রাহাতের জীবনসংগ্রাম শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকটকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের গল্প। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ এবং বাবা-মায়ের নিরলস প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
মুফতি হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এখন আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রাহাতের। পরিবারের আশা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন এবং একদিন তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ছেলের জন্য বাবা-মায়ের যে ত্যাগ ও সংগ্রাম, জেলা পরিষদের এই সহায়তা সেই দীর্ঘ পথচলায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
গাজীপুরে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা উন্নয়নে উপকারভোগীদের মধ্যে চেক বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার সকালে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এসব চেক বিতরণ করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার ড. চৌধুরী ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন।
আয়োজকরা জানান, গাজীপুরে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে রাজস্ব ও এডিপি বরাদ্দের আওতায় জেলায় বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য ৭৩ টি মসজিদ , মাদ্রাসা ও মন্দিরে ৫০ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়েছে।
রাহাতের মা তাছলিমা খানম লাকি বলেন, ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। পরিবারের খরচ চালিয়ে এই স্বপ্ন পূরণ হবার ছিল না। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পড়ে আবেদ করি অনুদানের জন্য। আবেদনের পর যাচাই করা করা হয়। পরে জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ড. চৌধুরী ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী আমাদের হাতে ২০ হাজার টাকার অনুদানের চেক আমাদের হাতে তুলে দেন। গাজীপুর জেলা পরিষদের অনুদানের চেক আমাদের দুশ্চিন্তা দুর করে দিয়েছে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ড. চৌধুরী ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে জেলা পরিষদ গাজীপুরে এক হাজার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকে ৭৩ টি মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া একজন প্রতিবন্ধী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
প্রতিনিধি/ এজে