Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

পচন রোগে নিঃস্ব গাংনীর একাঙ্গী চাষিরা, মাঠে মাঠে হাহাকার

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বিভিন্ন মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সুবাসিত একানি বা একাঙ্গী ফসলের খেত। তবে কসবা ও জালশুকা গ্রামসহ উপজেলার মাঠজুড়ে সেই সুবাস আর সবুজ সতেজতার মাঝে এখন বিষাদের ছায়া। ক্ষতিকারক পচন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অর্ধ শত কৃষক। 

উপজেলা কৃষি দফতরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৮ হেক্টর জমি বলা হলেও মাঠপর্যায়ে প্রায় ১০-১৫ হেক্টর জমির একাঙ্গী ফসল পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন স্থানীয় চাষিরা; মাথায় হাত পড়েছে তাদের।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে লাভজনক এই ভেষজ ও মসলা জাতীয় উচ্চ মূল্যের ফসল একাঙ্গী চাষে মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তারা। চড়া দামে বীজ ক্রয়, জমি তৈরি, সার ও কীটনাশকের পেছনে জমানো পুঁজি ও হাড়ভাঙা খাটুনি ঢেলে একটি ভালো ফসলের স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ গোড়া পচা রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করে একের পর এক খেত। গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঢলে পড়ার পাশাপাশি মাটির নিচের মূল্যবান একাঙ্গী পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

গাংনীর কসবা গ্রামের (পূর্বপাড়া) ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রবিউল ইসলাম ছলছল চোখে বলেন, ‘অনেক আশা করে ১০ শতক জমিতে একাঙ্গী চাষ করেছিলাম। ধার-দেনা করে সার ও কীটনাশক দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ পচন ধরে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো খেত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো ওষুধেই কাজ হচ্ছে না। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, আর পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব ভেবে পাচ্ছি না।’ 

একই কথা জানান কসবা গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন, বদরুদ্দোজাও। 

s

সরেজমিনে বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, একের পর এক খেত পচে লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। ফসল বাঁচাতে চাষিরা বারবার একাধিক কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনেকেই পচা গোড়া উপড়ে ফেলে ক্ষোভ ও হাহাকার প্রকাশ করছেন। 

কৃষকদের অভিযোগ, রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি দফতরের কোনো কার্যকর তদারকি বা সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে বাজার থেকে নিম্নমানের কীটনাশক কিনে প্রয়োগ করায় উল্টো ক্ষতি আরও বেড়েছে।

ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকদের দাবি- অনতিবিলম্বে সরকারি প্রণোদনা, বিনাসুদে কৃষি ঋণ এবং আগামী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করা না হলে এই অঞ্চলে লাভজনক মূল্যের এ ফসলের চাষ একেবারেই বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়বে। একই কথা জানান কৃষক বদরুদ্দোজা ও সাদ্দাম আলী।

কৃষি বিভাগের ধানখোলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাঈমুর রহমান জানান, চলতি বছরে একাঙ্গী পচন রোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুরুর দিকে চাষিদের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করেও রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। অতি তাপমাত্রা ও অতিবৃষ্টির প্রভাবকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। একই অভিমত কসবা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিন রেজা জুয়েল ও গাড়াডোব ব্লকের গিয়াস উদ্দিনের।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আরাফাত মিয়া জানান, অনেক কৃষক বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করেন না। আবার অনেকে সঠিক জমি নির্বাচন না করে নিচু জমিতেও চাষ শুরু করেন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এবার ফসল পচে গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আবহাওয়াগত পরিবর্তন এবং মাটিতে ছত্রাকের উপদ্রব বাড়ার কারণেই একাঙ্গী ফসলে এই পচন রোগ দেখা দিয়েছে। খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করছি এবং পচন রোধে সঠিক মাত্রায় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছি। 

তিনি আরও বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে, যেন কৃষকদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা যায়। এছাড়া বিষয়টি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রোগতত্ত্ববিদদেরও জানানোর চেষ্টা চলছে।

প্রতিনিধি/এএইচ