জেলা প্রতিনিধি
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে চলছে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। তবে এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মা ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা চলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে একাধিক চক্র জড়িত।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার ১০ দিন পার হলেও অনেক নিবন্ধিত জেলে সরকারি খাদ্যসহায়তার চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি কর্মহীন জেলেদের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১০ দিনে লক্ষ্মীপুরে ৯৩টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৮৩ জন জেলেকে আটক করা হয়। জব্দ করা হয়েছে ২ দশমিক ২৭২ মেট্রিক টন ইলিশ, ৯ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ মিটার মাছ ধরার জাল, ১৪টি নৌকা ও একটি স্পিডবোট। এ ছাড়া ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধভাবে মাছ শিকার ও পরিবহনের অভিযোগে করা ৪৯টি মামলায় ৩০ জন জেলেকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশ সংরক্ষণ ও প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীসহ দেশের ২০টি জেলার নির্ধারিত নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞাকালে নিবন্ধিত জেলেদের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা।
জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪২ হাজার ১৫০। তাদের জন্য মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফের ১ হাজার ৫৩ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে জেলায় জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
নদীতে মাছ শিকার, ঘাটে বেচাকেনা
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমনী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীরঘাট-সংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লি এবং দক্ষিণ চর রমনী মোহনের নদীতীরবর্তী কয়েকটি এলাকা ঘুরে মাছ শিকার ও বেচাকেনার চিত্র দেখা যায়। এ সময় কয়েকটি নৌকা নিয়ে জেলেদের ঘাটে ফিরতে দেখা যায়। মাছ ব্যবসায়ীরা নৌকা থেকে দরদাম করে ইলিশ কিনছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোস্টগার্ডের ট্রলার দেখা গেলে মাছ বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়। ট্রলার চলে যাওয়ার পর আবারও তা শুরু হয়।
চর রমনী মোহনের কয়েকজন জেলে বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে থেকেই তারা মাছ ধরতে পারছেন না। এখন শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো কঠিন। তাদের দাবি, ২৫ কেজি চাল দিয়ে ২২ দিন একটি পরিবারের খরচ মেটানো সম্ভব নয়। তাদের একজন বলেন, সরকার যদি তাদের পরিবারের দায়িত্ব নিত, তাহলে তারা মাছ ধরতে নদীতে নামতেন না।
ওই জেলেদের অভিযোগ, মেঘনার সাহেবের চর ও চর মেঘয়া এলাকায় বড় বড় ট্রলারে করে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা হচ্ছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি থাকলেও এসব ট্রলারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে, ছোট নৌকায় মাছ শিকার করা জেলেদের ঘাটে বারবার অভিযান চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
রামগতি ও কমলনগরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
রামগতি বাজার মাছঘাট-সংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লি বা মান্তাপাড়ায় সকাল, বিকেল ও রাতে ইলিশ কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, বিকেলে মাছ ধরতে যাওয়া আট থেকে ১০টি নৌকা সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে ঘাটে ফেরে। এ ছাড়া রাতে মাছ শিকার করা আরও ১২ থেকে ১৫টি নৌকা ভোরে ঘাটে আসে। এসব মাছ কিনতে বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা সেখানে যান।
ঘাটে উপস্থিত তিনজন মাছ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে এসব নৌকা পরিচালিত হচ্ছে। তাদের দাবি, নদীতে মাছ শিকারে নামা জেলেদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় এবং পুলিশসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সিরাজ ব্যাপারী ও ইসমাইল মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা ওই এলাকা থেকে মাছ কিনছেন। তাদের দাবি, সেখানে প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী নিয়মিত মাছ কেনাবেচা করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেনের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা কম।
কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে সাতটি নৌকায় মা ইলিশ ধরা হচ্ছে। মতিরহাটের এক মাছ ব্যবসায়ীর দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় একটি চক্র প্রায় ৩০টি মাছ ধরার ট্রলার নদীতে নামিয়েছে। এসব ট্রলারে ধরা ইলিশ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সাহেবের চরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু সদস্যের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুই উপজেলার ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অভিযুক্ত নেতাকর্মীরা।
সহায়তা না পেয়ে বিপাকে জেলেরা
শুক্রবার সন্ধ্যায় কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটের পূর্ব পাশে একটি ভাসমান জেলেপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, ফরহাদ নামের এক জেলে মাছ ধরার দুই বস্তা জাল নৌকায় তুলছেন। পাশে ছিলেন পল্লির সর্দার বাবুল মাঝিসহ কয়েকজন।
ফরহাদ বলেন, তার পরিবারে সদস্য নয়জন। সরকারি অভিযানের সময় কোনো সহায়তা পান না বলে অভিযোগ তার। মাছ ধরেই সংসার চালাতে হয়। নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে না নামলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নৌকা বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কাও করছেন তিনি।
রায়পুর উপজেলার হাজিমারা, আলতাফ মাস্টারঘাট, সাজু মোল্লারঘাট ও রাউলঘাট-সংলগ্ন কয়েকটি স্থানেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নিষেধাজ্ঞার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
চরকালকিনি ইউনিয়নের মনির মাঝি, শরীফ মাঝি ও জাহাঙ্গীর মাঝি বলেন, তারা সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনে নৌকা ডাঙায় তুলে রেখেছেন। কিন্তু ১০ দিন পার হলেও সরকারি চাল পাননি। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয় নেই, আবার সহায়তা পেতেও দেরি হচ্ছে। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে খাদ্যসংকটে পড়েছেন তারা।
জেলেদের একটি অংশের অভিযোগ, সরকারি সহায়তা প্রকৃত জেলেদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে না নামা জেলেরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন। তাদের মতে, সময়মতো সহায়তা পৌঁছালে জেলেদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা সহজ হবে।
চরকালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছায়েফ উল্যাহ বলেন, তার ইউনিয়নে প্রায় ৩ হাজার ১০০ জেলে রয়েছেন। তাদের নিবন্ধন কার্ড সংগ্রহে সময় লাগায় চাল বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। রোববার থেকে প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান তিনি।
নিয়মিত অভিযান চলছে: মৎস্য বিভাগ
রামগতি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের নাম তিনিও শুনেছেন। গত দুই দিনে তিনি ওই এলাকায় কয়েকবার গেছেন এবং অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে ফোনে সতর্ক করেছেন। কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের শুরু থেকেই মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ কাজ করছে। প্রথম ১০ দিনে ৯৩টি অভিযান চালিয়ে ৮৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। ৩০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তাদের উদ্দেশ্য শুধু সাজা দেওয়া বা জরিমানা আদায় করা নয়; সরকারি নির্দেশনা সম্পর্কে জেলেদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ। এরপরও বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে মাছ শিকারের খবর তাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
সচেতন মহলের মতে, মা ইলিশ রক্ষার অভিযান সফল করতে নদীতে নিয়মিত টহল, অবৈধ মাছ শিকার ও বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি চাল দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের তালিকা প্রণয়ন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রতিনিধি/এসএস