Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

রিসোর্টে আগুন: ‘আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব’

জেলা প্রতিনিধি

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

‘আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা’— কথাগুলো বলতে বলতে নির্বাক হয়ে যান কক্সবাজারের উখিয়া ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে ছেলে-মেয়ে ও নাতি হারানো মো. জিয়াদুল কবির। শোকে পাথর হয়ে গেছেন মা কাজল রেখাও। 

এ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তাদের একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম (২৬), একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির (৩২) ও নাতি ফাইজান নূর (৬)।

জিয়াদুল কবির আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের কালিপুরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সদ্য অবসরপ্রাপ্ত যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে মো. জিয়াদুল কবিরের মেয়ের জামাতা নূর আলম চুয়াডাঙ্গা থেকে স্ত্রী ফারিহা কবির (৩২), শ্যালক নাসির সিয়াম (২৬), ছেলে ফাইজান নূর (৬) এবং তার দুই ভায়রার পরিবারের আরও ছয়জনসহ মোট ১০ জনকে নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়া ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একে একে প্রাণ হারান পরিবারের প্রিয়জনরা। 

একমাত্র ছেলে, একমাত্র মেয়ে ও আদরের নাতিকে হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ জিয়াদুল কবির ও তার স্ত্রী কাজল রেখা। যে সংসার ছিল সন্তানদের হাসি-আনন্দে ভরপুর, সেই সংসারেই নেমে এসেছে মাতম।

জিয়াদুল কবিরের একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম আমতলীর একটি বেসরকারি স্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকার সেন্ট যোসেফ কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক শেষ করে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে যান নাসির। কিন্তু সেই আনন্দভ্রমণই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে- তা কে জানত!

কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার পর শুক্রবার সকালে জরুরি কাজের জন্য স্ত্রী ফারিহা কবির, ছেলে ফাইজান নূর ও শ্যালক নাসির সিয়ামকে সেখানে রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন নূর আলম। প্রাণে বেঁচে গেলেও স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হারিয়ে তিনিও এখন শোকের গভীর সাগরে নিমজ্জিত।

এ ঘটনায় জিয়াদুল কবিরের দুই ভায়রার তিন মেয়েও প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে মালিহা (২৮) এ বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। নাভিলাও এ বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। মালিহা ও নাভিলা ঢাকার বনশ্রী এলাকার তিতাস রোডের মুনসুর রশীদের মেয়ে। আর আলভী (২৬) ছিলেন অপর ভায়রা সেলিম মিয়ার মেয়ে। তিনি ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা সবাই একই এলাকার বাসিন্দা। স্বপ্নে বিভোর তরুণীদের এমন করুণ মৃত্যুতে পরিবারগুলোর ওপর নেমে এসেছে অপূরণীয় শোক।

ছেলে, মেয়ে, নাতি ও ভায়রার তিন মেয়েকে হারানোর খবর পেয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন জিয়াদুল কবির। 

মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম, একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির ও নাতি ফাইজান উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে। আমার এখন বেঁচে থেকে লাভ কী? কী নিয়ে আমি বাঁচব? সব তো আমার শেষ হয়ে গেছে।

কথাগুলো বলতে বলতে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেন তিনি। যে সন্তানদের ঘিরে ছিল তার বেঁচে থাকার সব স্বপ্ন, সেই সন্তানরাই আজ নেই। নেই আদরের নাতিও। এমন শূন্যতা নিয়ে কীভাবে কাটবে বাকি জীবন! 

স্ত্রী কাজল রেখাও শোকে ভেঙে পড়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ছেলে, মেয়ে, নাতি সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা আর দুনিয়ায় বেঁচে থেকে কী করব? ও আল্লাহ, আমাদেরও এখন নিয়ে যাও।

মেয়ে ফারিহা কবিরের স্বামী নূর আলমও কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে তিনি বলেন, স্ত্রী, ছেলে, শ্যালক চলে গেছে। আল্লাহ, আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখলে? ওদের সঙ্গে আমাকেও নিয়ে গেলে বেঁচে যেতাম।

এদিকে মালিহা ও নাভিলার বাবা মুনসুর রশিদ এবং মা রোকসানা আক্তার রীনা কান্নায় ভেঙে পড়ে ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার জান নাভিলা ও মালিহা চলে গেছে। ও আল্লাহ, আমাদের কেন মৃত্যু দাও না? আমাদেরও ওদের সঙ্গে নিয়ে যাও।

অন্যদিকে, আলভীর বাবা সেলিম ও মা নূর নাহারের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। সন্তান হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণায় তারা বারবার মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা বলেন, আমি এখন কাকে আদর করব? ও আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে এখন ফিরিয়ে দাও।

এ ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মণি বলেন, আমরা এ মর্মান্তিক ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত ও সমব্যথী। স্বজনহারা পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা জানাই এবং তাদের এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোকের মুহূর্তে পাশে আছি।

প্রতিনিধি/এলএ