১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম
নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকায় পাশাপাশি রয়েছে মসজিদ ও মন্দির। এক পাশে ‘পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদে’ নামাজ আদায় কার হয়, অন্য পাশে মাত্র ৩০-৪০ ফুট দূরে ‘মহিষখোলা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে’ চলে পূজা-অর্চনা। নামাজের সময় বন্ধ থাকে পূজার গান-বাজনা, নামাজ শেষে আবার শুরু হয় পূজার আয়োজন। এভাবেই বছরের পর বছর মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নামাযের সময় মুসলিমরা নামাজ আদায় করছেন এবং অন্য দিকে চলছে দেবি দুর্গার পূজা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চিত্রা নদের কুল ঘেঁষা পাকা সড়কের পাশ দিয়ে ছোট্ট একটি গ্রাম মহিষখোলা। গ্রামটির সড়ক দিয়ে হাঁটতেই চোখে পড়ে একটি বড় আঙিনা। আঙিনার এক পাশে মসজিদ অন্য পাশে মন্দির।
পাশে রয়েছে সান বাঁধানে নদীর ঘাট, সেখানে কেউ অজু করছেন আবার কেউ পূজার সামগ্রী পানিতে পরিষ্কার করছেন। নামজের সময় হলেই মসজিদ থেকে বের হচ্ছে আযানের সুমধুর সুর। দলে দলে মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষেরা সেখানে নামাজ আদায় করছেন।
আবার অন্যদিকে নামাজ শেষ হতেই ডাক, ঢোল শঙ্খ এবং উলুধ্বনির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো আঙিনা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভক্তিভরে দেবির আরাধনা করছেন।
দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে স্ব- মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ অপর পাশে মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মন্দির।
ওই আঙিনায় ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন মুসল্লিরা। মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যা চলে প্রাত্যহিক পূজা-অর্চনা।
একই স্থানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম সম্পাদন করেন। এ নিয়ে কখনো কারও কোনো সমস্যা হয়নি।
পূজার সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নির্বিঘ্নে পূজা করেন। আবার নামাজের সময় মসজিদে মুসলিমরা নামাজ পড়েন। আযানের পর থেকে নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের গান বাজনা বন্ধ রাখেন হিন্দু সম্প্রদায়।
শুধু দুর্গা পূজা নয়, এক আঙিনায় মন্দির - মসজিদ, ধর্মীয় সম্প্রীতির এ দৃষ্টান্ত দেখতে দূর দুরন্ত ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। তারা স্থানটি ঘুরে ঘুরে দেখেন।
মসজিদে নামাজ পড়তে আসা তাহের আলী মোল্যা বলেন, ‘আমরা যার যার ধর্ম পালন করি। নামাজের সময় পূজার গান-বাজনা বন্ধ থাকে। নামাজ শেষে আবার শুরু হয়। এ নিয়ে কখনও সমস্যা হয়নি।’
পূজা মণ্ডপে ঘুরতে আসা হৃদয় দাস বলেন, ‘একই জায়গায় মসজিদে নামাজ আর মন্দিরে পূজা হতে দেখে ভালো লাগছে। এখানকার মানুষ একে অপরের ধর্মকে সম্মান করেন।’
মন্দিরে পূজা দিতে আসা হিলা ভক্ত নামে এক পূজারি বলে, ‘এক আঙিনায় মন্দির ও মসজিদ রয়েছে। এটি শুনেই পরিবার নিয়ে মন্দিরে এসোছি। বেশ সময় ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সবাই এখানে যার যার ধর্ম পালন করছেন।
‘এখানে কোনো হিংসা প্রতি হিংসা নেই। সবাই খুশিমনে একে অপরকে সাহায্য করছেন। মসজিদ থেকে মুসলিমরা নামাজ শেষ করে এসে মন্দির কমিটির সাথে কথা বলছেন। পূজার সামগ্রিক বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। এসব দেখে বেশ ভালোই লাগছে। শুধু নড়াইল নয়, দুই ধর্মের এই সম্প্রীতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। ’
মসজিদের খতিব হাফেজ এনামুল হক বলেন, ‘আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, তারা তাদের ধর্ম পালন করেন। এতে কোনো সমস্যা হয় না। ইসলাম অন্যের ধর্মকে অসম্মান করতে শেখায় না, বরং সব ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায়।’
মসজিদ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান রহমান বলেন,‘নামাজের সময় মন্দিরের সকল বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করে রাখেন মন্দির কমিটি। আমাদের নামাজ শেষে তারা পূজা অর্জনা করেন। বাদ্য যন্ত্র বাজান। পূর্ব পুরুষ হতে আমাদের গ্রামে দুই সম্প্রদায়ের মাঝে ধর্মীয় সম্প্রীতি রয়েছে। ভবিষ্যতে এ সম্প্রীতি বজায় থাকবে বলে আশা করি।’
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শুভংকর সরকার (টুপাল) বলেন, ‘দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে আমাদের মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মন্দির এবং পাশেই পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ রয়েছে৷
‘আমরা দুই ধর্মের মানুষ এখানে অসাম্প্রদায়িক ভাবে সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছি। আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। আমাদের মন্দিরে নামাজের সময়সূচি রয়েছে, যখনই নামাজের সময় হয় তখন আমাদের মন্দিরের সকল গান বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ’
তিনি আরও বলেন, ‘মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের এই পূজা শুধু নড়াইলের ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ নয়, এটি সারাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ। আমরা এখানে উভয় ধর্মের মানুষ ভালো আছি, সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছি। আমাদের আগামী প্রজন্ম এই সম্প্রীতি ধরে রাখবে বলে আশা করি।’
নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. রকিবুল হাসান বলেন, ‘পূজা মণ্ডপগুলোতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও কাজ করছেন।’
প্রতিনিধি/এএম