জেলা প্রতিনিধি
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম
আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য প্রমাণ'- দিনে এই পোস্ট দেওয়ার পর রাতে গুলি করে হত্যা
সাংবাদিকতার পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ (Detective Article) নামে একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। সেখানে মাদক-চোরাচালানসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে লেখালেখি করতেন।
ওই পেইজ থেকেই বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে 'আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য প্রমাণ' এমন একটি পোস্ট দেন আলিফ।
পরে রাত সোয়া ৮টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের উতরাইল বাজারে তাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়।
লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা যায়, আলিফকে সামনে থেকে ছয়টি গুলি করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল, যা ময়নাতদন্তের সময় উদ্ধার করা হয়েছে।
কলমাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা আলিফ ফকির। বসবাস করতেন ময়মনসিংহ শহরে। তবে এলাকায় এলে পাশের দুর্গাপুর উপজেলার তেলুঞ্জিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে দ্বিতীয় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার কাছে থাকতেন। আলিফের প্রান্থি নামে চার বছর বয়সী মেয়ে ও আইয়ান সাফয়ান নামে দেড় বছর বয়সী ছেলে রয়েছে।
আলিফ বেসরকারি আইপিটিভি রূপসী বাংলার নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামান আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল।
এছাড়া গত বছরের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় আলিফ ফকিরকে হত্যার উদ্দেশে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তবে ভাগ্যগুণে সেদিন আলিফ প্রাণে বাঁচলেও তাকে ভেবে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
থানা পুলিশও আলিফের জীবনের ঝুঁকি টের পেয়েছিলেন। চলাফেরায় আলিফকে সতর্ক হতে বলেছিলেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ। তবে এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই নির্ভয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলেন আলিফ।
এদিকে আলিফের মৃত্যুর পর দুই শিশুকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা।
নিহত আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সংমা জানান, একটি সংবাদের জেরে আলিফকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তার ব্যবহৃত মোবাইলফোনটা চেক করলেই এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। তবে ঘটনার পর আলিফের মোবাইলফোন পুলিশ নিয়ে গেছে। এর আগেও একাধিকবার আলিফকে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
দৈনিক যায়যায়দিনের নেত্রকোনা প্রতিনিধি সোলাইমান হোসেন রুবেল বলেন, দুর্গাপুর-কলমাকান্দা এ দুটি সীমান্ত এলাকার মাদক, চোরাচালান, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম দুর্নীতি আলিফ তার ফেসবুকে তুলে ধরতেন। এর আগেও কয়েকবার তাকে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কাজের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হোক।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠ ছিলেন আলিফ। লেখায় অনিয়ম অপরাধ তুলে ধরায় স্থানীয়ভাবে তার অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। অনেকবার তাকে সতর্কভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ দিয়েছি। এলাকায় এলে আমাকে জানিয়ে রাখতে বলেছিলাম তাকে। যেন ওই এলাকায় একটু বাড়তি পুলিশি টহল দেওয়া যায়। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে কলমাকান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি তাজা গুলি ও কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। আলিফের ব্যবহৃত মোবাইলফোন উদ্ধার করা হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হচ্ছে। অনেকগুলো বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
প্রতিনিধি/এলএ