Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

‘আগেও একাধিকবার হত্যার চেষ্টা, অবশেষে গুলিতে নিহত হলেন সাংবাদিক আলিফ’

জেলা প্রতিনিধি

১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার মাদক, চোরাচালান, ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির কারণে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে আগেও একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করেছে সন্ত্রাসীরা।

সবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌর শহরের শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের পাশে উতরাইল বাজারে তাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামান আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল।

এছাড়া গত বছরের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় আলিফ ফকিরকে হত্যার উদ্দেশে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তবে ভাগ্যগুণে সেদিন আলিফ প্রাণে বাঁচলেও তাকে ভেবে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

তবে জীবনের ঝুঁকি থাকলেও অনিয়ম ও অপরাধ তুলে ধরতে পিছপা হননি আলিফ। থানা পুলিশও আলিফের জীবনের ঝুঁকি টের পেয়েছিলেন।

চলাফেরায় আলিফকে সতর্ক হতে বলেছিলেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ। 

তবে এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই নির্ভয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলেন আলিফ। অবশেষে তাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। 

শুক্রবার দুপুরে আলিফের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে বিকালে কলমাকান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, সাংবাদিক আলিফের শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল, যা ময়নাতদন্তের সময় উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি জানান, সাংবাদিক আলিফের বুকের অংশে তিনটি গুলি লাগে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি পিঠের দিকে শরীরের ভেতরে আটকে থাকে। অপর তিনটি গুলির একটি গুলি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এছাড়া আরেকটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্য একটি গুলি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে চলে যায়।

নিহত আলিফ ফকির রূপসী বাংলা টিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন। তার গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। প্রায় সময় তিনি ময়মনসিংহে থাকতেন। তবে এলাকায় এলে পাশ্ববর্তী দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে দ্বিতীয় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার কাছে থাকতেন। আলিফের প্রান্থি নামে চার বছর বয়সী মেয়ে ও আইয়ান সাফয়ান নামে দেড় বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। তার মৃত্যুর পর দুই শিশুকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন আনন্দিতা সাংমা।

নিহত আলিফের 'ডিটেকটিভ আর্টিকেল' পেজে ঘুরে দেখা যায়, তার সর্বশেষ পোস্টগুলোর একটি হলো- ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য প্রমাণ...।’ এই পোস্টটি গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় দেন তিনি। পরে রাতেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

নিহত আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সংমা জানান, একটি সংবাদের জেরে আলিফকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তার ব্যবহৃত মোবাইলফোনটা চেক করলেই এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। তবে ঘটনার পর আলিফের মোবাইলফোন পুলিশ নিয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

চ্যানেল ওয়ানের নেত্রকোনা প্রতিনিধি রানা আকন্দ বলেন, অনিয়ম অপরাধ তুলে ধরতে আপসহীন ছিলেন আলিফ। এর আগেও কয়েকবার তাকে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও তিনি দমে যাননি। গত বছরের জানুয়ারিতে একবার আলিফকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। তখন ওই সময়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক। 

চেহারার মিল থাকার কারণে আলিফকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আলিফ নিজেই আমাদের এসব বলেছে।  

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী কন্ঠ ছিলেন আলিফ। লেখায় অনিয়ম অপরাধ তুলে ধরায় স্থানীয়ভাবে তার অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। অনেকবার তাকে সতর্কভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ দিয়েছি। এলাকায় এলে আমাকে জানিয়ে রাখতে বলেছিলাম তাকে। যেন ওই এলাকায় একটু বাড়তি পুলিশি টহল দেওয়া যায়। 

তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি তাজা গুলি ও কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। আলিফের ব্যবহৃত মোবাইলফোন উদ্ধার করা হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হচ্ছে। অনেকগুলো বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। 

ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, আলিফের নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল। সে বিষয়ে তাকে সাবধান করা হয়েছিল। এর আগে চেহারার মিল থাকার কারণে আলিফকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে তার ধারণা। এ বিষয়টা আলিফই সবাইকে বলত।

প্রতিনিধি/এলএ