জেলা প্রতিনিধি
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪০ এএম
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে প্রায় ১০০ ফুট ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়ছে ঝরনার জলরাশি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ পানির ধারা। চারপাশে উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, বুনো ঝোপঝাড় আর নাম না জানা রঙিন ফুলের সমারোহ। কাছে গেলেই হিমশীতল পানির ছোঁয়ায় মন ভরে ওঠে স্নিগ্ধতায়। প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকে নিয়ে যেতে পারে কল্পনার রাজ্যে।
বলছি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার হৃদয়মেম্বারপাড়ায় অবস্থিত রিসাং ঝরনার নিচের দ্বিতীয় ঝরনা তেরাং তৈকালাইয়ের কথা। পাহাড়, ছড়া ও ঝরনার মিতালিতে সাজানো এই প্রাকৃতিক স্থান শরতে হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের নতুন আকর্ষণ।
নামের অর্থ ও অবস্থান
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মারমা ভাষায় ‘রিসাং’ শব্দের অর্থ উঁচু স্থান থেকে জলরাশি গড়িয়ে পড়া। ত্রিপুরা ভাষায় রিসাং ঝরনার আরেক নাম ‘তেরাং তৈকালাই’।
খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে এ ঝরনার অবস্থান। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকেও এর দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। মূল সড়ক থেকে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে যেতে হয় ঝরনার দিকে। জুমচাষের সূত্র ধরে ১৯৯৪ সালে প্রাকৃতিক এই ঝরনাটি আবিষ্কৃত হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পাহাড়ি পথ, ছড়া আর ঝরনার টানে
মূল সড়ক থেকে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নিচে নামলেই দেখা মেলে ছড়ার। ছড়ার বাঁ পাশ ধরে প্রায় ১০০ গজ হাঁটলে পৌঁছানো যায় দ্বিতীয় ঝরনায়। ছড়ার শীতল পানিতে বড় বড় পাথর আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি তৈরি করে ভিন্ন এক অনুভূতি।
পথ চলতে শোনা যায় নানা প্রজাতির পাখির ডাক। বর্ষাকালে দূর থেকেই ভেসে আসে ঝরনার পানির শনশন শব্দ। পাহাড়ের গা ঘেঁষে আঁকাবাঁকা পথে এগোতে এগোতে চোখ আটকে যায় চারপাশের সবুজে। ছড়া ধরে হাঁটার পর দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত ঝরনার।
পাথরের ঢাল বেয়ে স্বচ্ছ পানির ধারা নিচে নেমে আসার দৃশ্য এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। পানির কলকল শব্দ, পাহাড়ের সবুজ আর নির্মল বাতাস মিলিয়ে তৈরি হয়েছে শান্ত ও মনোরম পরিবেশ। কিছুক্ষণ ঝরনার পাশে দাঁড়ালেই শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে দূরে অন্য এক জগতে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়।

জুমের সোনালি ধান, নীল আকাশ আর শুভ্র মেঘ
ঝরনা ঘুরতে যাওয়ার পথে পাহাড়ের ঢালে দেখা যায় জুমচাষের দৃশ্য। কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও নিচু টিলা, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢালজুড়ে সবুজ জুমক্ষেত। শরতে জুমের ধান সোনালি রং ধারণ করতে শুরু করে। কোথাও কৃষকেরা ধান ঘরে তুলছেন। পাহাড়ের সবুজের সঙ্গে সোনালি ধানের এই মিতালি প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে।
পাহাড়ি সড়ক ধরে রিসাং ঝরনার দিকে এগোতে গেলে দুই পাশের দৃশ্য পথকেও ভ্রমণের অংশ করে তোলে। মাথার ওপর গাঢ় নীল আকাশ, তার বুকে তুলোর মতো ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘ আর পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এই রূপ পর্যটকদের বারবার থেমে ছবি তুলতে উৎসাহিত করে।
পর্যটকদের চোখে দ্বিতীয় ঝরনা
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা আসছেন রিসাং ঝরনা এলাকায়। ঢাকার বাড্ডা থেকে বেড়াতে আসা সুমাইয়া বলেন, ‘রিসাং ঝরনার নিচের ঝরনাটি খুবই সুন্দর। পাহাড়, ছড়া ও ঝরনা একসঙ্গে দেখতে পেয়ে সত্যিই আনন্দিত।’

কুমিল্লা থেকে আসা হৃদয়, জমি ও সোহেল বলেন, পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে কিছুটা কষ্ট হলেও এক ভ্রমণে দুটি ঝরনা দেখার সুযোগ পেয়েছেন তারা। ছড়া দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল অন্য রকম। স্বচ্ছ ও শীতল ঝরনার পানিতে ভিজে তাদের প্রাণ জুড়িয়ে গেছে।
তবে দ্বিতীয় ঝরনায় পৌঁছাতে দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ি পথ পেরোতে হয়। এ কারণে অনেক পর্যটক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সেখানে যেতে পারেন না।
যাতায়াত সহজ হলে বাড়বে পর্যটক
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দাবি, দ্বিতীয় ঝরনায় যাতায়াতের জন্য সিঁড়ি নির্মাণ এবং আশপাশের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে জায়গাটি নতুন পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি দুটি ঝরনাকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়বে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য শান্তিময় ত্রিপুরা বলেন, রিসাং ঝরনার নিচের দ্বিতীয় ঝরনাটি দেখতে সুন্দর, তবে সেখানে যেতে কিছুটা কষ্ট হয়। প্রশাসনের উদ্যোগে সিঁড়ি নির্মাণ করা হলে পর্যটকের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া গাড়ি রাখার জায়গা ও বিদ্যুতের ব্যবস্থাও জরুরি বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে জেলা প্রশাসন সব সময় তৎপর রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে যাতায়াতব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হবে।
কখন যাবেন
বর্ষাকালে পাহাড়ি ঝরনায় পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। তবে অতিবৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আবার শীতকালে অনেক ঝরনার পানিপ্রবাহ কমে যায়। তাই বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসার পর শরতের নির্মল আকাশ ও স্নিগ্ধ পরিবেশে রিসাং ঝরনা ভ্রমণ উপভোগ্য হতে পারে। তবে ভ্রমণের আগে আবহাওয়া ও পাহাড়ি পথের অবস্থা জেনে নেওয়া উচিত।

ভ্রমণে সতর্কতা
পাহাড়ি ঝরনায় আনন্দ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্ক থাকা জরুরি। পাথরের গায়ে শ্যাওলা জমে থাকলে তা অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে যায়। বিশেষ করে পানির স্রোত বেশি থাকলে পাথুরে ঢালে ওঠানামা কিংবা পানির ওপর দিয়ে চলাচল বিপজ্জনক হতে পারে। তাই পিচ্ছিল পাথরে ওঠা, স্রোতের মধ্যে নামা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল বেয়ে চলাচল এড়িয়ে চলুন। দুর্গম পথে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নেওয়াও ভালো।
কীভাবে যাবেন
খাগড়াছড়ি শহর থেকে: পিকআপ, জিপ বা চাঁদের গাড়ি, সাফারি, সিএনজি, মাহিন্দ্র কিংবা মোটরসাইকেলে রিসাং ঝরনা এলাকায় যাওয়া যায়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিকআপ বা জিপে যাওয়া-আসার ভাড়া প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মোটরসাইকেলে জনপ্রতি যাওয়া-আসার ভাড়া প্রায় ১০০ টাকা বলে জানানো হয়েছে। অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রে আগে ভাড়া ঠিক করে নেওয়া ভালো। ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও জিপে ঝরনার গেট পর্যন্ত যাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়; এরপর কিছু পথ হেঁটে যেতে হতে পারে।
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি: ঢাকা থেকে এসি ও নন-এসি বাসে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা এবং নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৮৫০ টাকা। বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রবি এক্সপ্রেস, সেন্টমার্টিন, হানিফ, শ্যামলী, ইম্পেরিয়াল, শান্তি, এস আলম, ইকোনো ও ঈগল পরিবহনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাত্রার আগে রুট, সময়সূচি ও ভাড়া যাচাই করে নিন।

চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি: চট্টগ্রামের বায়েজিদ ও অক্সিজেন মোড় থেকে শান্তি পরিবহনের বাস এবং কদমতলী ও অক্সিজেন মোড় থেকে বিআরটিসির বাস চলাচল করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভাড়া প্রায় ৩৪০ টাকা। যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া ভালো।
কোথায় থাকবেন
রাতযাপনের জন্য খাগড়াছড়ি শহরে বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে পর্যটন মোটেল, হোটেল গাইরিং, অরণ্য বিলাস, হোটেল ইকোছড়ি ইন, হোটেল অবকাশ ও বর্ণ রিসোর্টের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্ষভাড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। মৌসুম, কক্ষের ধরন ও বুকিংয়ের সময় অনুযায়ী ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে।
কোথায় খাবেন
পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন পর্যটকেরা। খাগড়াছড়ি শহরের পানখাইয়াপাড়ার সিস্টেম রেস্তোরাঁ, মহাজনপাড়ার ব্যাম্বু শুট রেস্তোরাঁ ও কল্যাণী রেস্তোরাঁ, পানখাইয়াপাড়ার হেরিটেজ ডাইং এবং শাপলা চত্বর এলাকার সাদামাটা রেস্তোরাঁয় খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ি খাবারের স্বাদ নিতে এসব রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখতে পারেন।
প্রতিনিধি/এসএস