Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ড্রাগনের রক্তিম আভায় নতুন স্বপ্ন: রাজবাড়ীতে বাম্পার ফলন

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম

রঙিন ফলের সমারোহে এখন মুখরিত রাজবাড়ীর মাটি। জেলার কৃষি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে অত্যন্ত লাভজনক বিদেশি ফল ‘ড্রাগন’ কম খরচে অধিক মুনাফা অর্জিত হওয়ায় এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় রাজবাড়ীতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলের আবাদ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামেই গড়ে উঠেছে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগান। প্রায় দুই একর জমির ওপর বিস্তৃত এই বিশাল বাগানে বর্তমানে শোভা পাচ্ছে প্রায় চার হাজার ড্রাগন গাছ। প্রতিটি গাছে লাল ও গোলাপি রঙের পাকা ড্রাগনের ঝুলন্ত দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়।

বাগান মালিক ও কর্মচারীদের মতে, প্রতিটি গাছে গড়ে ১০ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত ফল ধরেছে। বর্তমানে ভরা মৌসুমে বাগানটি থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ মণ (২,০০০ কেজি) তাজা ড্রাগন ফল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বর্তমানে স্থানীয় পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ড্রাগন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে। কেবল স্থানীয় চাহিদার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই এই বাগান। রাজবাড়ীর রসালো, মিষ্টি ও সুস্বাদু ড্রাগন ফল এখন সরবরাহ হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর, কুষ্টিয়া এবং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় পাইকারি বাজারে। তাজা ও রাসায়নিকমুক্ত ফল কিনতে স্থানীয় ক্রেতা ও পাইকাররা এখন প্রতিদিন বাগান প্রাঙ্গণেই ভিড় জমাচ্ছেন।

S

বাগানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও ফলন সম্পর্কে বাগানের ম্যানেজার জমাদি উল আলম বলেন, ‘এখানকার মাটির উর্বরতা ও আবহাওয়া ড্রাগন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা প্রথম থেকেই নিয়ম মেনে সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক সময়ে সেচ প্রদান এবং আধুনিক উপায়ে গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করেছি। নিয়মিত যতœ ও কঠোর তদারকির ফলেই এবার গাছে আশাতীত ফলন এসেছে। প্রতিটি গাছে যেভাবে ফল ধরেছে, তাতে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমরা কেবল ফলনের পরিমাণের দিকেই নজর দিচ্ছি না, বরং রাসায়নিকের অপব্যবহার রোধ করে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও মানসম্মত ড্রাগন ফল উৎপাদনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের মানুষের হাতে পুষ্টিকর ও নিরাপদ ফল পৌঁছে দেওয়া।’

বাগান থেকে সরাসরি ড্রাগন ফল কিনতে আসা বাজিতপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাজার থেকে ফল কিনলে অনেক সময় বাসি বা কেমিক্যালযুক্ত হওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু এই বাগানে এসে একদম গাছ থেকে নিজেদের সামনে তাজা ও রক্তিম ড্রাগন পেড়ে কিনতে পারছি—এই অনুভূতিটাই দারুণ! এখানকার ফলগুলো বেশ বড়, মিষ্টি ও রসালো। পরিবারের পুষ্টির কথা চিন্তা করে বাগান থেকেই সরাসরি ফল কিনতে এসেছি।’

ফরিদপুর থেকে আসা ফলের পাইকারি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রাজবাড়ীর এই বাগানের ড্রাগন ফলের সাইজ ও গুণগত মান অত্যন্ত চমৎকার। বাজারে এই এলাকার ড্রাগন ফলের চাহিদা খুব বেশি। গ্রাহকরা রাজবাড়ীর মিষ্টি ড্রাগন ফল বেশ পছন্দ করছেন। তাই আমি নিয়মিত এখান থেকেই পাইকারি দরে ফল কিনে ফরিদপুরের বাজারে নিয়ে বিক্রি করি। বাগান থেকে ফ্রেশ ফল পাওয়ায় আমাদের বিক্রিও খুব ভালো হয়।’

রাজবাড়ী সদর শহর থেকে পরিবার নিয়ে বাগানে আসা দর্শনার্থী ও ক্রেতা ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘বাগানজুড়ে সারিবদ্ধ গাছে ঝুলন্ত ড্রাগন ফল দেখতে দারুণ লাগে, যেন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য! বাচ্চারা খুব আনন্দের সাথে বাগানে ঘুরে লাল-গোলাপি ফলগুলো দেখছে। আমরা যেমন ছুটির দিনে ঘুরে আনন্দ পেলাম, তেমনই কোনো ভেজাল ছাড়া গাছপাকা পুষ্টিকর ফল কিনে ঘরে ফিরছি।’

S

কৃষকদের এই অভাবনীয় সাফল্যে সার্বক্ষণিক ছায়া হয়ে পাশে রয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করছেন এবং উদ্যোক্তাদের গাছের পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও আধুনিক পরিচর্যার নানাবিধ দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাক খান বলেন, ‘ড্রাগন চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। আমরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, সুষম সার ব্যবহার এবং রোগবালাই প্রতিরোধে সরাসরি পরামর্শ দিচ্ছি। সঠিক পরামর্শের ফলে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছেন।’

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নিয়মিত তদারকি প্রদান করায় রাজবাড়ী জেলা খুব দ্রুত ড্রাগন উৎপাদনে একটি ‘মডেল জেলা’য় পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জনি খান। 

তিনি জানান, উদ্যোক্তাদের সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন উদ্যোক্তা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ড্রাগন চাষে এগিয়ে আসেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সহায়তা ও কৃষি বিভাগের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনায় রাজবাড়ীর এই ড্রাগন বিপ্লব কেবল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীই করছে না, বরং সমগ্র জেলার কৃষি অর্থনীতিতে যুক্ত করছে এক নতুন ও সম্ভাবনাময় মাত্রা।

প্রতিনিধি/এএইচ