জেলা প্রতিনিধি
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
মা ইলিশ সংরক্ষণে বরিশালের নদ-নদীতে একের পর এক অভিযান চালিয়েও অবৈধভাবে ইলিশ শিকার বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযানে জাল ও মাছ জব্দ, জেল-জরিমানা করেও থামানো যাচ্ছে না অসাধু জেলেদের তৎপরতা। কোথাও কোথাও অভিযান পরিচালনাকারী সদস্যদের লক্ষ্য করে জ্বলন্ত আগুনের গোলা ও ইট-পাটকেল ছুঁড়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে। এতে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ছয়দিনে বরিশাল জেলার ১০ উপজেলায় ১৪৯টি অভিযান চালিয়ে ৬৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে ৮৬টি মামলা করা, এক লাখ ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ৩৩০ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি জব্দ করা হয়েছে নয় লাখ ৬৫ হাজার ১০০ মিটার নিষিদ্ধ জাল।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মৎস্য অধিদফতরের বরিশাল জেলা কার্যালয়ের ৮ থেকে ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সারাদেশে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকার, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। এরপরও বরিশালের মেঘনা, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ছয়দিনে সবচেয়ে বেশি অভিযান পরিচালিত হয়েছে হিজলা উপজেলায়। সেখানে ৩৩টি অভিযানে ৩০টি মামলা করা হয়েছে। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২১ জনকে। এ ছাড়া ছয় লাখ ২৬ হাজার মিটার নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় ২২টি অভিযানে ২৬টি মামলা করা হয়েছে এবং ১৮ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মুলাদীতে ১৯টি অভিযান চালিয়ে দুটি মামলা করা হয়। বরিশাল সদর উপজেলায় ১৮টি অভিযানে ২০টি মামলা করা হয়েছে এবং ১৮ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাবুগঞ্জে ১৩টি, গৌরনদীতে ১১টি, উজিরপুরে ১০টি, বাকেরগঞ্জে ১২টি এবং বানারীপাড়ায় ১১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে জেলায় মোট ২৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়।
অভিযানে জব্দ করা নিষিদ্ধ জালের আনুমানিক মূল্য ৭৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। বিপুল পরিমাণ জাল জব্দের পরও নদীতে অবৈধ মাছ শিকারের তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
হিজলার মেঘনা নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা চললেও নদীতে ইলিশ শিকারের তৎপরতা থেমে নেই। অভিযানের খবর পেলে অনেকে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থানে সরে যান। আবার কোথাও অভিযান পরিচালনাকারীদের দিকে ইটের টুকরা বা আগুনের গোলা ছুঁড়ে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
হিজলার মেঘনা নদীতীরের বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়েও নদীতে জেলেদের নৌকা দেখা যায়। প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে, জালও ধরছে; কিন্তু কিছু লোক সুযোগ পেলেই মাছ শিকারে নামছে। নদীর সব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে এভাবে ইলিশ রক্ষা করা কঠিন।’
ওই এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে ও জাল জব্দ করে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় নদীতে টহল জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ মাছ শিকারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, মা ইলিশ রক্ষায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্যজীবী সংগঠন ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করা দরকার। এতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের তথ্য দ্রুত প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোঁড়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিদিন অভিযান চলছে। তবে অসাধু জেলেরা অভিযানে বাধা সৃষ্টি করতে আমাদের ওপর ইট ছুঁড়ে হামলা চালাচ্ছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছি।’
তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, কারাদণ্ড ও জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শুধু অভিযান ও জেল-জরিমানা যথেষ্ট নয়, নদীতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়াতে হবে। অভিযানে বাধা ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেরা যাতে জীবিকা নিয়ে সংকটে না পড়েন, সে জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন রক্ষায় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
প্রতিনিধি/এসআই