জেলা প্রতিনিধি
১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
দেশের জনপ্রিয় সোনালি মুরগির প্রথম উদ্ভাবন হয় জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে। এক সময় খামারীদের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির আজ বেহাল দশা।
জরাজর্ণী অবকাঠামো ও জনবল সংকট হওয়ায় খুড়ে খুড়ে চলছে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি। এতে যেমন কমেছে মুরগি উৎপাদন, অন্যদিকে ক্রমাগত লোকসানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সরকারি এই খামারটি।
অবকাঠামো সংস্কার ও জনবল সংকট দুর করে প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করার দাবি স্থানীয়দের। সমস্যা সমাধানে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারের প্রধান কর্মকর্তা।
জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে প্রায় ৩২ বিঘা জমির উপর জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। ২০০৮ সালে সেখানে স্থাপন করা হয় আধুনিক হ্যাচারি। ২০০০ সালে দেশের জনপ্রিয় সোনালি মুরগির উদ্ভাবন হয়েছিল এই খামার থেকেই। এখান থেকেই এই মুরগি ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।
এই খামার ঘিরে জয়পুরহাটসহ উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠে হাজার হাজার ছোট-বড় মুরগির খামার। শুধু জয়পুরহাটেই গড়ে ওঠে প্রায় ১০ হাজার ছোট বড় খামারি। বর্তমান এ জেলার মুরগি জেলার চাহিদা মিটিয়ে সারাদেশে সরবরাহ হয়। এই সোনালি মুরগি স্থান পেয়েছে জেলার ব্র্যান্ডিং হিসেবে।
সরকারি এই খামারের ডিম, বাচ্চা ও সোনালি মুরগি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় খামারটির সুদিন আজ হারিয়ে গেছে। খামারের ১২টি সেডের মধ্যে ৪টি জরাজর্ণী হওয়ায় এক যুগ ধরে একেবারে পরিত্যক্ত। বাকি ৮টি সেডও রয়েছে ঝুঁকিতে। সামান্য বৃষ্টিতেই জং ধরা টিনের ফুটো চুইয়ে ভেতরে পানি পড়ে, ফলে খামারজুড়ে মুরগীতে ছড়িয়ে পড়ে রোগবালাই। এছাড়া খসে পড়তে শুরু করেছে খাদ্যগুদামের ছাঁদ, বেড় হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে ২০ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ৭ জন। এতে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মচারীরা, কমে গেছে উৎপাদন। সেই সাথে দিন দিন বাড়ছে লোকসানের বোঝা। খামারটির হ্যাচারিতে প্রতিবছর ২ লাখ মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয়। বর্তমানে ৮টি সেডে রয়েছে ৩ হাজার ৬০০ মুরগি ও ১ হাজার বাচ্চা। প্রতি পিস বাচ্চা ১৫ টাকা বিক্রি হলেও এর উৎপাদন খরচ ২২ টাকা, আর প্রতিকেজি মুরগির দাম দেড়শো টাকা হলেও এর উৎপাদন খরচ ২০০ টাকার বেশি। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে অবকাঠামো সংস্কার ও জনবল নিয়োগের দাবি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও স্থানীয়দের।
খামারের কর্মচারী দুলাল পাহান বলেন, ‘প্রথম দিকে আমরা এখানে ২০ জনের মতো স্টাফ কাজ করতাম। কমতে কমতে তা ৭ জনে এসেছে। খামার আগে যেভাবে চলেছে, এখন সেভাবে চলছে না। ভাঙা বাড়ির মতো হয়ে গেছে। প্রতিটা সেডের টিন ফুটো, বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। এতে মুরগির রোগবালাই হয়। খাদ্য গুদামের ছাঁদ ভাঙা, আমাদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।’
আরেক কর্মচারী হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই খামার থেকে মুরগি নিয়ে একসময় অনেক নতুন নতুন খামারি সৃষ্টি হয়েছে। তবে আজ খামারটির অনেক খারাপ অবস্থা। বৃষ্টি হলেই সেডে পানি পড়ে মুরগির খাদ্যের পাত্র ভিজে যায়। আমাদেরও কাজ করতে সমস্যা হয়। চারটি সেড জরাজীর্ণ হওয়ায় বন্ধ আছে। বড় দুইতলা সেডটির ছাঁদ ধ্বসে পড়ছে, বাঁশ দিয়ে কোনভাবে আটকে রাখা হয়েছে। জনবল কম থাকায় আমাদের বেশি কাজ করতে হয়। জনবল নিয়োগসহ সেডগুলো সংস্কার করলে প্রতিষ্ঠানটি আবার ভাল চলবে।’
জামালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সুশিল চন্দ্র বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি দেখে আসছি। আগে এখানে অনেক মুরগি ছিল। অনেক মানুষ আসতো মুরগি ও বাচ্চা নেওয়ার জন্য। কিন্তু আগের সেই দিন এখন আর দেখা যায়না। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেডগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মেরামত করার কোন উদ্যোগ দেখিনা। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করতে সেডগুলো সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি।’
খামারের উপ-পরিচালক ডা. মো. ওয়ালী-উল-ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে ২০ জনের মধ্যে ১৩টি পদই ফাঁকা রয়েছে। এজন্য খামার পরিচালনা করতে আমাদের একটু অসুবিধা হচ্ছে। এছাড়া ১২টি সেডের মধ্যে চারটি পরিত্যক্ত রয়েছে। একারণে আমাদের মুরগির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগ ও সেডগুলো সংস্কার হলে আমরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারব। বিষয়টি নিয়ে আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি।’
প্রতিনিধি/এএইচ