Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

গ্রাহকদের টাকা নিয়ে স্বামীসহ লাপাত্তা সমিতির ব্যবস্থাপক

জেলা প্রতিনিধি

১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

‘আমি অসহায় নারী। কিডনিডার সমস্যা। খুব চায়াচিন্তে ভিক্ষা করে এতোকাল এই টাকাটা জমায়ছিলাম। একুন সেই টাকাটা দিচ্ছেনা। আগের টিএনও কইছিল তুলে দিবোনে। সেই কয়া গেছে, আর দিচ্ছেনা। টাকাটা পালি কিডনিডা কাটতাম।’ 

আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার খোকসার শিমুলিয়া ইউনিয়নের পাইকপাড়া মির্জাপুর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী আমিনা খাতুন। 

তার ভাষ্য, তিনি পেশায় একজন ভিক্ষুক। তার কেউ নাই। তিনি কিডনি রোগে ভুগছেন। তিনি ১০ বছর ধরে ‘শক্তি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি’তে টাকা জমাচ্ছিলেন। কিন্তু সমিতির ব্যবস্থাপক ফাতেমা খাতুন সমিতির সব সঞ্চয়ের টাকা নিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। 

আমিনা খাতুন বলেন, শুরুতে দুই থেকে পাঁচ টাকা করে জমা দিলেও শেষ সময়ে প্রতি সপ্তাতে এক হাজার টাকা করে সঞ্চয় দিতেন। ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত এক লাখ ৬৬ হাজার টাকা জমা হয়েছিল।

খোকসার মানিককাট গ্রামের মরিয়ম খাতুন নামের আরেক ভুক্তভুগী বলেন, আমি এই সমিতিতে ঢুকিছি ২০০৪ সালে। আমরা সবাই গরীব মানুষ। প্রথমের দিকে সপ্তাহে দু টাকা করে সঞ্চয় করেছিলাম। এর পরে আবার ৫ টাকা করে সঞ্চায় করিছিলাম। তার পরে আবার ১০ টাকা করে এভাবে ২২ সাল পর্যন্ত আমার ১ লাখ টাকা হয়েছিলো। আশা ছিল মেয়ের বিয়ের সময় খরচ করব। কিন্তু তার আগেই ফাতেমা টাকা নিয়ে পলায়ছে। আমি এর বিচার চাই। 

শুধু ভিক্ষুক আমেনা বা গৃহিনী মরিয়ম নয়, অন্তত চার শতাধিক অসহায় ও দুস্থ নারীদের সঞ্চয়ের প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ২০২২ সালের ২৫ লাপাত্তা হয়েছেন খোকসার পাইকপাড়া মির্জাপুরের শক্তি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপক ফাতেমা খাতুন। তিনি ওই এলাকার মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী। সমিতির সঞ্চয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে মাহফুজও পলাতক বলে জানিয়েছেন সদস্যরা।  

সমিতিতে জমাকৃত সঞ্চয়ের টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে মানবন্ধন করেন ভুক্তভোগী কয়েক’শ নারী। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ বিন মনসুরের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। 

S

সদস্যদের ভাষ্য, সংসারের খরচ বাঁচিয়ে কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করে, কেউবা হাঁস-মুরগির ডিম ও চাল বিক্রি করে দুই টাকা, পাঁচ টাকা, ১০ টাকা করে সমিতিতে জমিয়েছিলেন প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে আপদ বিপদে কিংবা সংসারের প্রয়োজনেই খরচ করবেন জমানো টাকা। কেউবা চেয়েছিলেন মেয়ে বিয়ের সময় ঘরের আসবাব কিনবেন।  

কিন্তু সব আশা ভরসায় এখন যেন শেষ। সমিতির ব্যবস্থাপক ফাতেমা খাতুন জমানো সব টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন। এতে জমানো টাকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সমিতির অন্তত চার শতাধিক নানাববয়সি নারী সদস্য।

জানা গেছে, ২০০৪ সালে পাইকপাড়া মির্জাপুর এলাকায় শক্তি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন স্থানীয় নারী। তারা সংসারের খরচ মিটিয়ে প্রতি সপ্তাতে দুই টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় জমা রাখতেন সমিতিতে। হিসাব রক্ষণের জন্য সদস্যরা পাইকপাড়া মির্জাপুর এলাকার মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী ফাতেমা খাতুনকে ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু ফাতেমা সদস্যদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ২০২২ সালের ২৫ জুন সমিতির সঞ্চয়ের প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। 

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বসাবসি করা হলে ৬ মাসের মধ্যে ফাতেমা টাকা পরিশোধ করবেন বলে ৩০০ টাকার স্টাম্পে লিখিত দেন। কিন্তু এতদিনে টাকা ফেরত না দেওয়ায় আজ দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরের প্রধান ফটকে মানববন্ধন শেষে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন ভুক্তভোগীরা। তারা দ্রুত টাকা ফেরত প্রদানের পাশাপাশি প্রতারক ফাতেমার শাস্তির দাবি জানান।
মিনা খাতুন নামের এক ভুক্তভোগী সদস্য বলেন, হাঁস, মুরগীর ডিম, চাল বেচে ২ টাকা, ৫ টাকা করে জমিয়েছিলাম। প্রায় ২২ হাজার টাকা জমা হয়েছিল। কিন্তু ফাতেমা সব নিয়ে পালিয়েছে। আমরা ফাতেমার বিচার চাই। টাকা ফেরত চাই। 

সমিতির সভানেত্রী তসলিমা সুলতানা বলেন, ফাতেমা শিক্ষক। সরল বিশ্বাসে তাকে ম্যানেজার করে টাকা জমা রাখতাম। কিন্তু প্রতারণা করে ৪০০ জনের গচ্ছিত প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে। আমরা সঠিক বিচারের দাবিতে মানবন্ধন শেষে ইউএনওর কাছে স্মারক লিপি জমা দিয়েছি। 

ভুক্তভোগীদের স্মারকলিপি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ বিন মনসুর। তিনি বলেন, অতীতে কথা দিয়েও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেননি ফাতেমা। এবার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/এএইচ