Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

সৈকতে ৫০ ফুটের প্লাস্টিক দানব, মানুষের অসচেতনতার প্রতিচ্ছবি

১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে আছে ৫০ ফুট উচ্চতার দৈত্যকার দানব। তার হাতে উপড়ে ফেলা নারিকেল গাছ, শরীরজুড়ে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসেছে কোনো ভয়ংকর প্রাণী। কাছে গেলে অবশ্য স্পষ্ট হয়, এটি কোনো কল্পকাহিনির দানব নয়; বরং মানুষের অসচেতনতা, ভোগবাদী আচরণ ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের প্রতীক। 

সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ভাস্কর্য। কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সৈকত থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা টানা ২০ দিনের শ্রমে নির্মাণ করেছেন এটি। কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা ও সিগাল পয়েন্টের মাঝামাঝি বালিয়াড়িতে স্থাপন করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্ম। ভাস্কর্যটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। 

তবে এটি নিছক পর্যটকদের আকর্ষণ করার কোনো শিল্পকর্ম নয়। মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কীভাবে প্রকৃতি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে, সেই বিপদের বার্তাই তুলে ধরছে প্লাস্টিকের এই দানব। এর হাতে উপড়ে ফেলা নারকেলগাছের প্রতীকী দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে ধ্বংস করার দায় শেষ পর্যন্ত মানুষেরই। 

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্লাস্টিক দূষণবিরোধী প্রতীকী আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। উদ্যোগটির লক্ষ্য, সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানুষের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল আচরণ উৎসাহিত করা। 

পর্যটনের সৌন্দর্যের আড়ালে প্লাস্টিকের বিপদ

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন লাখো পর্যটক। কিন্তু পর্যটকদের একাংশের অসচেতন আচরণে সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবন, নালার মুখ ও উপকূলীয় পরিবেশে জমছে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য নানা সামগ্রী। 

এসব বর্জ্য শুধু সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করে না; দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। প্লাস্টিক সহজে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। সূর্যের আলো, ঢেউ ও ঘর্ষণে বড় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক বালু, পানি ও সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করে। 

সমুদ্রের মাছ ও অন্যান্য প্রাণী খাবার ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলতে পারে। আবার পরিত্যক্ত জাল ও প্লাস্টিকের দড়িতে আটকে আহত হতে পারে সামুদ্রিক প্রাণী। এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্লাস্টিক বর্জ্য নালা ও পানিপ্রবাহের পথ আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতি অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। একটি বোতল বা প্যাকেট সৈকতে ফেলে যাওয়ার ঘটনাকে তুচ্ছ মনে হলেও লাখো মানুষের একই আচরণ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে। এ কারণে প্লাস্টিকের দানবের মতো প্রতীকী শিল্পকর্ম দূষণের অদৃশ্য পরিণতিকে মানুষের সামনে দৃশ্যমান করে তোলার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। 

ভাস্কর্য দেখে নিজেদের দায় উপলব্ধি করছেন পর্যটকেরা 

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক শাহরিয়ার শান্ত বলেন, ‘পরিবেশের জন্য প্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর, এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়েছে। এটি দেখে মানুষ যেন দূষণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে এবং সচেতন হয়। বিশেষ করে, এত দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত যেন আমরা নিজেরাই ময়লা করে না ফেলি। কোথাও বর্জ্য ফেলার আগে মানুষ যদি এই ভাস্কর্যটি দেখে সচেতন হয়, তাহলেই এ উদ্যোগ সার্থক হবে।

রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক তাবাসসুম জেরিন বলেন, আমরা পর্যটকেরা সমুদ্রসৈকতে এসে অনেক সময় চিপসের প্যাকেট, পানির বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে সৈকত নোংরা করি। মানুষের ফেলে দেওয়া সেই প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়েই তৈরি করা হয়েছে এই দানব। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আমাদের অসচেতনতা পরিবেশের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। 

গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক ফিরোজ কবির সুমন বলেন, সমুদ্রসৈকত একটি প্রাকৃতিক ও নান্দনিক স্থান। অথচ মানুষ প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য ফেলে এই সুন্দর পরিবেশ নোংরা করছে। এসব বর্জ্য দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যটির মূল বার্তা হলো, প্লাস্টিক ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। 

চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক মহিউদ্দিন জুয়েল বলেন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগও জরুরি। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু সরকারের উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এ জন্য সরকার ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। 

পর্যটকদের এসব বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বর্জ্য ফেলার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু সচেতনতামূলক বার্তা দিলেই হবে না, পর্যটকদের সেই বার্তা অনুসরণ করার সুযোগও তৈরি করতে হবে। 

পাঁচ টন বর্জ্যে পরিবেশ ধ্বংসের প্রতীক 

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক মুহাম্মদ মুবারক বলেন, ৫০ ফুট উচ্চতার এই প্লাস্টিক দানব তৈরিতে পাঁচ মেট্রিক টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণ কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, গাছ উপড়ে ফেলার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি, এই দূষণ কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও অক্সিজেনের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে নীরবে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তা অনেক সময় আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য বিপর্যয়কেই দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছি এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে।

বর্জ্যের বিনিময়ে সহায়তা, পুনর্ব্যবহারে গুরুত্ব 

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা সীমিত। তাই এই দূষণ রোধে জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই। 

তিনি বলেন, ২০২২ সাল থেকে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনে প্লাস্টিকবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চাল-ডাল দেওয়ার পাশাপাশি সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ পুনর্ব্যবহার ও ভাস্কর্য নির্মাণে কাজে লাগানো হয়। 

মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী ভাস্কর্যের মাধ্যমে মানুষের অবহেলায় ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কীভাবে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। 

তার মতে, প্লাস্টিক দূষণ রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলা এবং দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলা। 

পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশসচেতনতা তৈরিতে প্রতীকী উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে এর পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা। সৈকতের প্রবেশপথ, পর্যটকদের চলাচলের এলাকা ও খাবারের দোকানগুলোর কাছে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন রাখা, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, প্লাস্টিক আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। 

একইসঙ্গে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানমালিক, পরিবহনকর্মী ও পর্যটকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং বিকল্প পরিবেশবান্ধব সামগ্রীর ব্যবহার উৎসাহিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য সংগ্রহের পর তা কোথায় যাচ্ছে, কতটা পুনর্ব্যবহার হচ্ছে এবং কতটা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, সেসব বিষয়েও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণে সেন্টমার্টিন ও সোনাদিয়া দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে এ ধরনের প্রদর্শনী প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে মানুষ প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হবে বলে আশা করি। 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান বলেন, কক্সবাজারে দিন দিন প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। এতে সাগরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। 

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ পরিণতি থেকে পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব।

প্রতিনিধি/এএইচ