Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বাবার দেখানো পথে ছেলে সনির ঝালমুড়ি বিক্রির গল্প

১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

এক হাতে ঝালমুড়ির বাটি, অন্য হাতে সংসারের দায়িত্ব। মাথার ওপর কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ছাদ নেই, নেই মোটা অংকের পুঁজি। আছে শুধু পরিশ্রম করার মানসিকতা, সততার সঙ্গে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন। 

প্রতিদিন শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন মো. রেজওয়ান আহমেদ সনি। তার কাছে প্রতিটি ঝালমুড়ির প্যাকেট যেন শুধু খাবার নয়, এগুলো তার পরিবারের স্বপ্ন পূরণের একেকটি সিঁড়ি।

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশন এলাকার বাসিন্দা মো. শাহ আলমের ছেলে রেজওয়ান আহমেদ সনি প্রায় ১৫ বছর ধরে জংশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মে ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের ব্যস্ততা আর প্লাটফর্মের কোলাহলের মধ্যেই চলছে তার জীবনযুদ্ধ।

সরেজমিনে জংশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীরা ট্রেনের অপেক্ষায়। কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসে আছেন। এরই মাঝে সনির সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন একের পর এক ক্রেতা। কেউ ঝাল বেশি চান, কেউ কম দিয়ে ঝালমুড়ি নিতে পছন্দ করেন। নিজের হাতে যতœ করে ঝালমুড়ি তৈরি করে যাত্রীদের হাতে তুলে দেন সনি।

তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার ঝালমুড়ি বিক্রি হয়। এতে তার লাভ থাকে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এই সামান্য লাভই তার কাছে অনেক বড়। কারণ এই অর্থেই চলে পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ। পাশাপাশি ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচও বহন করেন তিনি।

অভাবের কারণে নিজের পড়াশোনা ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর এগোয়নি। ছোট বয়সেই তাকে বুঝতে হয়েছে সংসারের বাস্তবতা। বই-খাতা ছেড়ে হাতে তুলে নিতে হয়েছে জীবিকার উপকরণ। কিন্তু নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের কষ্ট তিনি ভাই-বোনের জীবনে দেখতে চাননি।

এক বোনকে কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। বর্তমানে ছোট ভাইকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। তার স্বপ্ন-ভাই-বোন যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। নিজের পড়াশোনা থেমে গেলেও অন্যের পড়াশোনার পথ তৈরি করে দেওয়ার এই চেষ্টা সনির জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সনির এই পথচলার পেছনে রয়েছে তার বাবা মো. শাহ আলমের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। প্রায় ৩০ বছর ধরে তার বাবা শায়েস্তাগঞ্জ জংশন এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি করেছেন। বাবার কাছ থেকেই ব্যবসার কৌশল শিখেছেন সনি। বাবার দেখানো পথেই ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি তার বাবা পাইকারীভাবে নাগা মরিচ ও বরিশালী আমড়া বিক্রিও করেন।

বাবা-ছেলের দীর্ঘদিনের সৎ পরিশ্রমের উপার্জনে একসময় জমি কিনেছেন। গড়ে তুলেছেন নিজেদের বাসা। একসময় যে পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, সেই পরিবার আজ নিজেদের একটি ঠিকানা দাঁড় করাতে পেরেছে। এই অর্জনের পেছনে নেই কোনো রাতারাতি ভাগ্য বদলের গল্প। রয়েছে বছরের পর বছর ঘাম ঝরানো শ্রম, ধৈর্য আর সততার উপার্জন।

জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সনি মনে করেন, মানুষের ভাগ্য বদলাতে হলে আগে নিজের চেষ্টা বদলাতে হয়। তিনি বলেন, ‘সৎপথে থেকে কঠোর পরিশ্রম করলে ভাগ্যের চাকা পাল্টানো সম্ভব। কোনো কাজকেই ছোট মনে করা উচিত নয়। পরিশ্রম করে উপার্জন করলে সেই উপার্জনে শান্তি থাকে।’

তার এই কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু জীবন তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা কোনো বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ট্রেনযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সনির তৈরি ঝালমুড়ির স্বাদ আলাদা। ঝাল, মসলা, নাগা মরিচ ও অন্যান্য উপকরণের সমন্বয়ে তিনি নিজের মতো করে ঝালমুড়ি তৈরি করেন। এ কারণে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রীদের কাছেও তার ঝালমুড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
নিয়মিত অনেক ক্রেতা জংশনে এলেই সনির ঝালমুড়ি খোঁজেন। ট্রেন ছাড়ার আগে যাত্রীরা ব্যস্ততার মধ্যেও তার কাছ থেকে ঝালমুড়ি কিনে নেন। ক্রেতার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিক্রিও বাড়ছে।

শায়েস্তাগঞ্জ জংশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মে সনিকে দেখে হয়তো অনেকেই শুধু একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতাকেই দেখেন। কিন্তু তার গল্পটা একটু ভিন্ন।

এই ঝালমুড়ির বাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন বাবার ৩০ বছরের শ্রমের ইতিহাস। জড়িয়ে আছে এক তরুণের ১৫ বছরের সংগ্রাম। জড়িয়ে আছে নিজের পড়াশোনা হারানোর কষ্ট। আর সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে ভাই-বোনের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। প্রতিদিন বদলে যায় যাত্রীদের মুখ। কিন্তু প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকেন সনি। হাতে ঝালমুড়ির বাটি, চোখে স্বপ্ন। তার স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়- পরিবার যেন ভালো থাকে, ভাই-বোন যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়, আর নিজের পরিশ্রমের টাকায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা যায়।

শায়েস্তাগঞ্জ জংশনের কোলাহলের মধ্যে তাই সনির ঝালমুড়ির ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে থাকে এক সংগ্রামী জীবনের গল্প- যে গল্প বলে, সততা আর পরিশ্রমের কাছে অভাবও একদিন হার মানে।

এএইচ