Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

পত্রিকার বিক্রি কমেছে, অনিশ্চয়তায় আজাহারের জীবন

০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম

একসময় সকাল হলেই পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতেন মানুষ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের বান্ডিল হাতে পাড়া-মহল্লায় ছুটতেন হকাররা। চায়ের দোকান, বাজার কিংবা বাড়ির বারান্দায় বসে মানুষ মেলে ধরতেন পত্রিকার পাতা। দেশ-বিদেশের খবর জানার প্রধান মাধ্যমই ছিল ছাপা সংবাদপত্র।

সেই সময়ের একজন সংবাদপত্র বিক্রেতা মো. আজাহার আলী। বয়স এখন ৬২ বছর। মাত্র ১৯ বছর বয়সে এই পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৪৩ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন প্রতিদিনের খবর। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলে গেছে মানুষের খবর পড়ার অভ্যাসও। সেই পরিবর্তনের ধাক্কায় কমেছে পত্রিকার বিক্রি, কমেছে আজাহার আলীর আয়। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার জীবন-জীবিকা।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ধানঘড়া এলাকার বাসিন্দা আজাহার আলী এখনো প্রতিদিন হাতে পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে বের হন। বয়সের ভারে হাঁটার গতি কমেছে, শরীর আগের মতো সঙ্গ দেয় না। তবুও জীবিকার তাগিদে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করেন।

সম্প্রতি সদর উপজেলার বোর্ডবাজার পুলিশ লাইন এলাকায় তার সঙ্গে কথা হয়। হাতে কয়েকটি পত্রিকার বান্ডিল। ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। কথায় কথায় উঠে আসে ৪৩ বছরের পেশাজীবনের নানা স্মৃতি।

আজাহার আলী বলেন, একসময় অনেক বেশি পত্রিকা বিক্রি করতেন। সকালে পত্রিকা নিয়ে বের হলে দ্রুতই বান্ডিল শেষ হয়ে যেত। এখন সেই চিত্র নেই। পাঠক কমেছে, বিক্রিও কমেছে। ফলে আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- পত্রিকার বিক্রি কমার পেছনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের খবর পাওয়ার ধরনে। আগে কোনো ঘটনা জানতে পরদিনের সংবাদপত্রের অপেক্ষা করতে হতো। এখন হাতে থাকা স্মার্টফোনেই কয়েক সেকেন্ডে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর পাওয়া যায়।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সারাক্ষণ খবর আপডেট হচ্ছে। ফলে অনেক পাঠকের কাছে পরদিন সকালে ছাপা পত্রিকা হাতে নিয়ে খবর পড়ার প্রয়োজনীয়তা আগের মতো নেই। একইসঙ্গে বদলে গেছে পাঠাভ্যাসও। অনেকে এখন বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়ার বদলে শিরোনাম, ছোট ভিডিও কিংবা সংক্ষিপ্ত আপডেটের মধ্যেই দিনের খবর জেনে নিচ্ছেন। পত্রিকার চাহিদা কমলে হকারদের বিক্রিও কমে যায়। আর বিক্রি কমার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় তাঁদের দৈনিক আয়।

আজাহারের জীবনে সেই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। ৪৩ বছর ধরে একই পেশায় থাকার পর এখন আর প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করতে চান না তিনি। কিন্তু বিকল্প কোনো আয়ের উৎসও নেই।

তিনি বলেন, আগে পত্রিকা বেশি বিক্রি হতো। এখন মানুষ মোবাইলেই খবর পড়ে। পত্রিকা কম নেয়। আয়ও কমে গেছে। বয়স হয়েছে, তারপরও সংসারের জন্য প্রতিদিন বের হতে হয়।

তার স্বপ্ন খুব ছোট। ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পুঁজি পেলে ছোট একটি ব্যবসা শুরু করতে চান। তাহলে প্রতিদিন পত্রিকার বান্ডিল হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে না। বয়সের শেষ সময়ে নিজের মতো করে কিছু করার সুযোগ পাবেন।

গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশনসংলগ্ন পত্রিকা বিতানের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রহমান বলেন, ২০২০ সালের আগে জেলা শহরে সব দৈনিক মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার কপি পত্রিকা বিক্রি হতো। বর্তমানে তা কমে প্রায় তিন হাজার কপিতে নেমেছে। তার মতে, অনলাইনে সহজে খবর পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ছাপা পত্রিকার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে।

পত্রিকার বিক্রি কমেছে, বদলে গেছে খবর পাওয়ার ধরন। সেই বদলের ভেতর আজাহার আলীর জীবনে এখন একটাই প্রশ্ন— আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে?

এএইচ