জেলা প্রতিনিধি
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
একটি কবর তখনও একেবারে নতুন। মাটিগুলোও ঠিকমতো বসেনি। স্বজনেরা কেউ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, কেউ বাড়ির পথে ফিরছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেই সেখানে শেষ আশ্রয় হয়েছে আব্দুল জলিলের (৭০)। জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোকে ঘরে শুয়ে ছিলেন তার স্ত্রী আমিনা বেগম (৬০)। কিন্তু কে জানত, স্বামীর কবরের মাটি শুকানোর আগেই তাকেও চলে যেতে হবে!
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে আব্দুল জলিলকে দাফন করা হয়। এর ঠিক এক ঘণ্টা পর, বিকেল ৫টার দিকে মারা যান আমিনা বেগম। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি জানাজা, দুটি দাফন। একই দিনে পাশাপাশি দুটি কবর। সন্তানদের জন্য একদিনেই বাবা-মা দুজনকে হারানোর নির্মম বাস্তবতা।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ মতিনবাজার এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর এমন মৃত্যুতে পরিবারটির পাশাপাশি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন প্রতিবেশীরাও।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রথমে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন আমিনা বেগম। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়ার মাত্র আড়াই ঘণ্টা পরই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন স্বামী আব্দুল জলিল। একই সময়ে দুজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
এরপর শুরু হয় দুজনের চিকিৎসা। স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল পরিবারের। একপর্যায়ে চিকিৎসা শেষে আব্দুল জলিলকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে তিনি মারা যান।
স্বামীর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন অসুস্থ আমিনা বেগমও। দীর্ঘ জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী মানুষটির চলে যাওয়া তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তবে তখনও কেউ ভাবেননি, তার বিদায়ও এতটা কাছাকাছি।
মঙ্গলবার বিকেলে আব্দুল জলিলের জানাজা শেষে বিকেল ৪টার দিকে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্বজনেরা তখনও কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ মোনাজাত করছিলেন। এর মাত্র এক ঘণ্টা পর বিকেল ৫টার দিকে মারা যান আমিনা বেগম।
একটি জানাজার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি জানাজার প্রস্তুতি নিতে হয় পরিবারকে। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও স্বামীর মৃত্যুর কান্না ছিল, সেখানেই আবার ওঠে স্ত্রীর মৃত্যুর আহাজারি। পরে বাদ মাগরিব আমিনা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্বামীর কবরের কাছেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকেও দাফন করা হয়।
নিহত দম্পতির ছেলে আলম মিয়া বলেন, ‘আমার বাবা-মায়ের মধ্যে অনেক মিল-মহব্বত ছিল। তারা একে অপরকে খুব ভালোবাসতেন। হয়ত সে কারণেই একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে একই দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।’
কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে আলম মিয়ার। তিনি বলেন, ‘বাবাকে বিকেল ৪টার দিকে দাফন করে বাড়িতে আসি। এর কিছুক্ষণ পরই, বিকেল ৫টার দিকে মায়ের মৃত্যু হয়। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনকেই হারালাম। এক দিনেই আমরা এতিম হয়ে গেলাম।’
সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, একই দিনে অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা খুবই বিরল। পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাদের জান্নাতবাসী করেন।
একটি কবরের মাটি তখনও নরম। তার পাশেই আরেকটি নতুন কবর। পাশাপাশি থাকা দুটি কবর যেন সাক্ষী হয়ে রইল দীর্ঘ এক দাম্পত্য জীবনের শেষ অধ্যায়ের—যে জীবনে তারা ছিলেন একে অপরের সঙ্গী, অসুস্থতাও এসেছিল কাছাকাছি সময়ে, আর শেষ বিদায়ও হলো মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে।
প্রতিনিধি/এসএস