০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম
এক হাতে খাতা-কলম, অন্য হাতে পুরোনো সাইকেল। গ্রামের মেঠোপথ ধরে কখনো হাঁটেন, কখনো সাইকেলে ছুটে যান এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। অপেক্ষায় থাকে একদল শিশু। কারও বাবার গৃহশিক্ষক রাখার সামর্থ্য নেই, কারও আবার স্কুলের পড়া বুঝতে সমস্যা। এসব শিশুর কাছে লুৎফর রহমান শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি যেন আশার আলো।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের এই মানুষটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে সম্মানী হিসেবে নেন মাত্র এক টাকা। অনেক সময় সেই এক টাকাও নেন না।
১৯৭৪ সাল থেকে তার এই পথচলা। নদীভাঙন ও অভাবের কারণে নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। সেই না-পাওয়ার কষ্টই যেন তাকে অন্য শিশুদের শিক্ষার পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা দিয়েছে। তার কাছে শিক্ষার মূল্য টাকা নয়; একটি শিশুর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঁধঘেঁষা এলাকায় লুৎফর রহমানের বসতি। নদীভাঙনে একসময় সর্বস্ব হারিয়ে তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল বাঁধের পাশে। নিজের জীবনেও অভাবের সঙ্গে লড়াই করেছেন। কিন্তু সেই অভাব তাকে থামাতে পারেনি।
স্বজনরা জানান, সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে কখনো বাগুড়িয়া, কখনো আশপাশের গ্রামের শিশুদের পড়াতে যান। স্কুলে পিছিয়ে পড়া ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিশুরাই তার প্রধান শিক্ষার্থী। চার দশকেরও বেশি আগে প্রতিদিন এক টাকা করে নিয়ে পড়ানো শুরু করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সবকিছুর দাম বেড়েছে বহু গুণ, বেড়েছে শিক্ষার খরচও। কিন্তু বাড়েনি লুৎফর রহমানের পড়ানোর ফি।
লুৎফর রহমানের এক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানান, তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শৈশবে অন্য শিক্ষকের কাছে পড়ার সামর্থ্য না থাকায় তিনি লুৎফর রহমানের কাছে মাত্র এক টাকায় পড়েছেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী হন।
এমন অসংখ্য শিক্ষার্থী তার কাছে পড়েছেন। কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যই লুৎফর রহমানের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
স্থানীয় ‘বই ঘর পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা মেহেদী হাসান বলেন, লুৎফর স্যার শুধু আমাদের পড়াননি, তিনি আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। অর্থের অভাবে কোনো শিশু যেন পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে—এটাই ছিল তার চিন্তা। এক টাকা সম্মানী নিয়ে তিনি যে কাজ করেছেন, তার মূল্য টাকায় পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তার মতো শিক্ষক আমাদের সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা।
‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমান বলেন, জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু কোনো শিশুকে টাকার অভাবে পড়াশোনা থেকে দূরে রাখতে চাইনি। শিক্ষার্থীরা যখন ভালো মানুষ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, তখনই আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয়। আজ যে সম্মান পেয়েছি, তা আমার একার নয়—যেসব শিক্ষার্থী আমার কাছে পড়েছে, তাদের সবার। আমার প্রত্যাশা, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও নতুন প্রজন্ম শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসবে। কোনো শিশু যেন অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে—এটাই আমার শেষ বয়সের চাওয়া।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, লুৎফর রহমানের দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবা সমাজের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, তা প্রশংসনীয়। তার এই স্বীকৃতি শুধু একজন শিক্ষককে সম্মানিত করা নয়, বরং মানবিক ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকতারও মূল্যায়ন। তার আদর্শ অনুসরণ করে আরও মানুষ শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াবেন—এটাই প্রত্যাশা।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে যখন শিক্ষকের মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন গাইবান্ধার প্রত্যন্ত গ্রামের এই প্রবীণ শিক্ষকের গল্পটি যেন অন্য এক বার্তা দেয়—শিক্ষকতা শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষের হাতে যখন অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে সত্যিকারের শিক্ষকতা।
তাই লুৎফর রহমান শুধু ‘এক টাকার মাস্টার’ নন— অভাবের অন্ধকারে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখা এক নীরব আলোকবর্তিকা।
প্রসঙ্গত, সোমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিয়েছে সরকার। ‘১ টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমানও সেই তালিকার একজন।
প্রতিনিধি/এএইচ