০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
গাইবান্ধার মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন। রাজা-বাদশাহ, জমিদার কিংবা সুফি-সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। শত শত বছরের পুরনো এসব মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, এগুলো এ অঞ্চলের ধর্মীয়, সামাজিক ও স্থাপত্য ইতিহাসেরও নীরব সাক্ষী।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় থাকা এসব মসজিদের কোনোটি ঘিরে রয়েছে জনশ্রুতি, কোনোটি আবার শিলালিপি ও নির্মাণশৈলীর কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও সংরক্ষণের অভাবে অনেক স্থাপনার প্রকৃত ইতিহাস এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
জামালপুর শাহী মসজিদ
সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বড় জামালপুরে অবস্থিত জামালপুর শাহী মসজিদ জেলার আলোচিত প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি। স্থানীয়ভাবে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত।

মসজিদটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নিয়ে মতভেদ রয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতিতে এর সঙ্গে সুফি সাধক হজরত শাহ জামালের (রহ.) নাম জড়িয়ে আছে।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ইংরেজ শাসনামলে কোনো এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে মসজিদটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। দীর্ঘদিন বনজঙ্গলে ঢাকা থাকার পর ষাটের দশকের শুরুতে তৎকালীন গাইবান্ধার মহকুমা প্রশাসক হক্কানী কুতুবউদ্দিন স্থানীয়দের কাছ থেকে এর ইতিহাস জানতে পারেন। পরে মসজিদটি খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মসজিদ কমিটির সহসভাপতি সৈয়দ মেসবাহুল ইসলাম রাশেদ ও সহসাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সামছুজ্জামান একরামের দাবি, পুরনো অবকাঠামোর ওপর বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণ করে বর্তমান তিনতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। তাদের ভাষ্য, মসজিদে অজুখানা, শৌচাগার, এসি, জেনারেটরসহ বিভিন্ন সুবিধা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।

মীরের বাগানের শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ
গাইবান্ধা সদর উপজেলার দাড়িয়াপুরে রয়েছে মীরের বাগানের ঐতিহাসিক শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এটি জেলার প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি। মসজিদের পাশেই রয়েছে শাহ সুলতান গাজীর মাজার।
মসজিদটির গাত্রের শিলালিপির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৩০৮ সালে সৈয়দ ওয়াজেদ আলী নামের এক ধর্মীয় ব্যক্তি মসজিদটি খুঁজে পান ও সংস্কার করেন। পরবর্তী সময়ে শাহ সুলতানের নামের সঙ্গে মসজিদটির পরিচিতি গড়ে ওঠে।
মসজিদ ও মাজারকে ঘিরে প্রতিবছর বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। ফলে ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি এটি স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতি ও জনজীবনেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

গোবিন্দগঞ্জের মাস্তা মসজিদ
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামারদহ ইউনিয়নের মাস্তা গ্রামে রয়েছে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পুরনো স্থাপনা—মাস্তা মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘লাল মসজিদ’ নামেও পরিচিত। উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে, ফাঁসিতলা বাজারের কাছাকাছি মহাসড়কের পাশে এর অবস্থান।
মসজিদটির নির্মাণকৌশল ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য দেখে স্থানীয়ভাবে এটিকে মুঘল আমলের কোনো এক সময়ের স্থাপনা বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটি প্রায় ৩৫ ফুট লম্বা ও ১৬ ফুট চওড়া। চার কোণে রয়েছে চারটি স্তম্ভ এবং ওপরের অংশে রয়েছে একই আকৃতির তিনটি গম্বুজ। তিনটি দরজা থাকলেও জানালা নেই।
মসজিদটি ঘিরে ‘বদশাহ ফকির’ নামের এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিকে নিয়ে স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে। তবে তার পরিচয় এবং মসজিদ নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে নিশ্চিত প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
পলাশবাড়ীর কাদিরবক্স মণ্ডল মসজিদ
পলাশবাড়ী উপজেলা শহরের নুনিয়াগাড়ী এলাকায় রয়েছে কাদিরবক্স মণ্ডল মসজিদ। আকারে ছোট হলেও এক গম্বুজবিশিষ্ট এই পুরনো মসজিদটি স্থানীয় ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাণকাল নিয়েও রয়েছে মতভেদ। স্থাপত্যটি দেখলে বোঝা যায়, অতীতে শুধু বড় পরিসরের মসজিদই নয়, ছোট পরিসরের ধর্মীয় স্থাপনাতেও স্থানীয় নির্মাণরীতি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গাইবান্ধার এসব প্রাচীন মসজিদের বৈশিষ্ট্য এক নয়। কোথাও শিলালিপি, কোথাও গম্বুজ ও নির্মাণশৈলী, আবার কোথাও লোককথা ও স্থানীয় স্মৃতিই ইতিহাসের প্রধান উপাদান। ফলে এসব স্থাপনার প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল, নির্মাতার পরিচয় ও স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন।
তাদের দাবি, শুধু তালিকাভুক্ত করলেই ঐতিহ্য রক্ষা হয় না। প্রয়োজন পুরনো নথি ও শিলালিপি সংরক্ষণ, স্থাপত্যের বিস্তারিত নথি তৈরি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং এসব স্থাপনার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। একইসঙ্গে জনশ্রুতি ও প্রামাণ্য ইতিহাসকে আলাদা করে নথিবদ্ধ করাও জরুরি।
বড় জামালপুর শাহী মসজিদের খতিব আশরাফুল ইসলাম আশরাফী বলেন, ইতিহাসের পাতা শুধু বইয়ে থাকে না; কখনো তা টিকে থাকে ইট, পাথর, গম্বুজ আর শিলালিপিতে। গাইবান্ধার প্রাচীন মসজিদগুলোও তেমনই একেকটি জীবন্ত দলিল। যথাযথ গবেষণা ও সংরক্ষণ করা গেলে এসব স্থাপনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, গাইবান্ধার অতীতের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হিসেবেও তুলে ধরা সম্ভব।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, জেলার ইউনিয়ন ওয়েব পোর্টালগুলোতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পর্যটন তালিকাতেও মীরের বাগানের শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ ও মাস্তা মসজিদের মতো স্থাপনা স্থান পেয়েছে।
এএইচ