Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

অসহায় সুচিত্রার পাশে মামুন বিশ্বাস, শেষ হলো তিনবার ভাঙা বিয়ের আক্ষেপ

জেলা প্রতিনিধি

০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

নিভৃতপল্লী থেকে শুরু করে লোকালয়ের আনাচে-কানাচে অসহায় মানুষ কিংবা ডানাভাঙা পাখির আর্তনাদ সবখানেই যার উজ্জ্বল উপস্থিতি, তিনি সিরাজগঞ্জের মামুন বিশ্বাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচক কাজে লাগিয়ে তিনি সংগ্রহ করেন তহবিল, গড়ে তোলেন জনমত।

দেশ-বিদেশের বিত্তবান ও সহানুভূতিশীল মানুষের সহায়তায় তিনি বহু মানুষকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এবার তেমনি একজন অসহায় সুচিত্রার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। 

বাবা সেলুনে কাজ করেন। মা একসময় চালকলে শ্রমিকের কাজ করলেও অসুস্থতার কারণে এখন কর্মহীন। দুই সন্তানকে নিয়ে চার সদস্যের সংসারে যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে বিয়ের খরচ জোগাড় করতে না পারায় তিনবার বিয়ে ভেঙে যায় সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল গ্রামের সুচিত্রা রানী দাসের।

তবে এবার আর ভাঙেনি বিয়ে। বরং দেশ-বিদেশের মানুষের সহযোগিতায় ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছে সুচিত্রার। শুক্রবার একই জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাট বোয়ালিয়া গ্রামের পলাশ কুমার ভৌমিকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

সুচিত্রা রানী দাস জামতৈল সূত্রধরপাড়ার সুজন চন্দ্র দাস ও কামনা রানী দাস দম্পতির মেয়ে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুশ্চিন্তায় ছিলেন বাবা-মা।

সুচিত্রার তিনবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত মামুন বিশ্বাস। পরে তিনি বিষয়টি তুলে ধরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটি দেখে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের পাঠানো অর্থে ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা সংগ্রহ হয়।

সেই অর্থে শুক্রবার সুচিত্রার বিয়ের আয়োজন করা হয়। উল্লাপাড়া উপজেলার হাট বোয়ালিয়া গ্রামের ঝড়ু লাল চন্দ্র ভৌমিক ও মমতা রানী ভৌমিক দম্পতির ছেলে পলাশ কুমার ভৌমিকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

সুচিত্রার মা কামনা রানী দাস বলেন, তিনি একসময় চালকলে কাজ করতেন। অসুস্থতার কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। তার স্বামী সেলুনে কাজ করলেও আগের মতো আয় নেই। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে তাদের খুব কষ্ট হয়। ঘরবাড়ির অবস্থাও ভালো নয়। অর্থের অভাবে মেয়ের তিনবার বিয়ে ভেঙে গেছে।

সুচিত্রা রানী দাস বলেন, এর আগে তিনবার বিয়ে ঠিক হলেও অর্থের অভাবে তা আর হয়নি। এবারও বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে তিনি ও তার বাবা-মা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু মামুন বিশ্বাস পাশে দাঁড়ানোয় শেষ পর্যন্ত বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। 

তিনি বলেন, তার মতো অসহায় একটি মেয়ের এত বড় আয়োজন করে বিয়ে হবে, তা কখনো ভাবেননি। সহযোগিতাকারীদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।

মামুন বিশ্বাস বলেন, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানোই আমার প্রাপ্তি, পথচলার প্রেরণা। ২০১৬ সালে জনপ্রিয় ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে 'ফেসবুকের ভিন্ন ব্যবহার' এর ওপর আমাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচার করে। প্রতিবেদনটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তখন থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অসহায় এতিম সুচিত্রার পাশে না দাঁড়ালে এবারও হয়তো মেয়েটির বিয়ে হতো না। প্রথমে সুচিত্রার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন। দেশ-বিদেশের মানুষের সহযোগিতায় ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা সংগ্রহ হয়। বিয়ের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর অবশিষ্ট ২৩ হাজার টাকা সুচিত্রার মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এই কৃতিত্ব তার নয়; দেশ-বিদেশ থেকে যারা সহযোগিতা করেছেন- কৃতিত্ব তাদের। তিনি শুধু উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মামুন বিশ্বাস আরও জানান, সুচিত্রার মতো অসহায় মেয়েদের বিয়ের জন্য ফেসবুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক বিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। তার দাবি, এসব বিয়ের পর মেয়েরা স্বামী-সংসার নিয়ে ভালো আছেন।

মামুন বিশ্বাসের জন্ম আর বেড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত আগনুকালী গ্রামে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আর বড় ভাই করেন ব্যবসা। ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা দেখাশোনার পাশাপাশি অসহায় মানুষ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এই যুবক। ২০১৩ সাল থেকে বন্যপ্রাণীর জন্য কাজ শুরু করেন তিনি। তখন প্রথমে গাছে গাছে মাটির কলস বেঁধে পাখির নিরাপদ আশ্রয়ে জন্য ব্যবস্থা করতেন তিনি। অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদান, মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, বন্যার্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, প্রতিবছর ঈদবাজার বিতরণ, হুইল চেয়ার দেওয়া, হারানো ব্যক্তিকে খুঁজে দেওয়া, সেলাই মেশিন বিতরণ, অটোভ্যান প্রদান, রোহিঙ্গাদের মাঝে অর্থ সহায়তা, গৃহপালিত পশু সহায়তা দেওয়া, শতাধিক এতিম ও অসহায় মেয়ের বিয়ের আয়োজন, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে অবমুক্ত করাসহ অসংখ্য কাজই যেন তার সম্পদ।

প্রতিনিধি/এলএ