জেলা প্রতিনিধি
০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার করনাইট গ্রামের মাছ চাষি মো. ওহাব আলী। পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন ২০০৫ সালে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে উৎপাদন, বাড়ে আয়। মাছ বিক্রির টাকায় এখন সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন অন্যদের জন্যও।
ওহাব আলীর মতো ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে মাছ চাষ। কেউ ছোট পুকুরে শুরু করে এখন বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন করছেন, আবার কেউ মাছ চাষকে করেছেন পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। পুকুরের পানিতে তাই শুধু মাছ নয়, অনেক পরিবারের স্বপ্নও বেড়ে উঠছে।
তবে সেই স্বপ্নের পথ দিন দিন যেন কঠিন হয়েছে উঠছে। মাছের খাদ্য, ওষুধ ও পোনার দাম বাড়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ। প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় অনেকে চাইলেও বড় পরিসরে মাছ চাষে যেতে পারছেন না। সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তাদের অনেকেই মাঝপথে থেমে যাচ্ছেন।
ওহাব আলী বলেন, আমি বর্তমানে একটি ৮ বিঘা ও আরেকটি প্রায় ২৫ বিঘা আয়তনের দুইটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছি। বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। কিন্তু খাদ্য, ওষুধসহ মাছ চাষের প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সহজ ঋণ ও সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো হলে আরও বড় পরিসরে মাছ চাষ করা সম্ভব হবে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁওয়ে মাছ চাষির সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। জেলার প্রায় ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ। বিপরীতে জেলার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৭ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বছরে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন মাছের ঘাটতি রয়েছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকার পুকুরে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদনের কারণে অনেক উদ্যোক্তা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তৈরি করছেন কর্মসংস্থান। পুকুর প্রস্তুত, মাছের খাবার ও ওষুধ সরবরাহ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ ঘিরেও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের কাজের সুযোগ।
মাছ চাষি মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, মাছ চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন নতুন অনেক উদ্যোক্তা এই খাতে আসছেন। প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা পাওয়া গেলে মাছ চাষ আরও বাড়ানো সম্ভব।
মো. দবিরুল ইসলামও মাছ চাষ করে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। তিনি বলেন, অনেকে অল্প পরিসরে মাছ চাষ শুরু করে এখন বড় আকারে করছেন। তাদের দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। সরকার যদি সুদ মুক্ত বা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আরও অনেক মানুষ এই পেশায় আসতে পারবেন।
চাষিরা বলছেন, পুকুর খনন থেকে শুরু করে মাছের পোনা, খাদ্য ও ওষুধ কেনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই বেড়েছে খরচ। ফলে বাড়তি বিনিয়োগ করতে না পারায় অনেকের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ হচ্ছে না। আবার বাজারে মাছের দাম কমে গেলে লোকসানের আশঙ্কাও থাকে।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের মাছের চাহিদা শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার উৎপাদিত মাছ যাচ্ছে আশপাশের বিভিন্ন জেলাতেও। বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা এসে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই বাজার আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, সরকারি সুযোগ সুবিধা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মাছ চাষিদের ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। মাছের খাদ্যের দাম কমানো ও ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সরবরাহের জন্যও সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, চাষিদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চাষিদের সুযোগ সুবিধার পরিধি বৃদ্ধি করা হলে ঠাকুরগাঁওয়ে চাহিদার তুলনায় বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।
ওহাব আলীর মতো আরও হাজারো চাষির কাছে মাছ চাষ এখন শুধু একটি পেশা নয়, পরিবারের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার অবলম্বন। পুকুরে মাছ বড় হওয়ার সঙ্গে বড় হচ্ছে তাদের আয় ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও। কিন্তু বাড়তি খরচ ও অর্থের সংকট সেই সম্ভাবনার পথকে কঠিন করে তুলছে।
প্রতিনিধি/এলএ