Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

সাপ্তাহিক ছুটিতে তেঁতুলিয়ায় পর্যটকের ঢল, কুয়াশায় আড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘা

জেলা প্রতিনিধি

০২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৯ এএম

সাপ্তাহিক ছুটি আর শরতের আগমনী আবহে প্রকৃতির অপরূপ সাজে সেজেছে দেশের সর্বউত্তরের উপজেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। হিমালয়কন্যা খ্যাত এ জনপদে নেমেছে পর্যটকের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। কারও চোখে প্রকৃতির টান, আবার কারও অপেক্ষা শুভ্র সৌন্দর্যের প্রতীক কাঞ্চনজঙ্ঘার এক ঝলক দেখার।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) ভোরের আলো ফুটতেই তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলো টিলা ও সীমান্তঘেঁষা মহানন্দা নদীর তীরে জমতে থাকে পর্যটকদের ভিড়। কেউ ক্যামেরা হাতে অপেক্ষা করছেন, কেউবা মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন কুয়াশাভেজা ভোরের মায়াবী দৃশ্য। তবে কাঙ্ক্ষিত কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা না পাওয়ায় অনেকের চোখে মুখে ফুটে ওঠে হতাশার ছাপ।

গত কয়েক দিন ধরে ভোর থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকছে তেঁতুলিয়ার আকাশ ও চারপাশের জনপদ। এর সঙ্গে রয়েছে হালকা মেঘ। ফলে উত্তর আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বচ্ছ অবয়ব ধরা পড়ছে না। টানা দুই দিন ধরে পর্বতশৃঙ্গটির দেখা না মেলায় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন পর্যটকেরা।

তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা অধরা থাকলেও তেঁতুলিয়ার প্রকৃতি থেমে নেই। কুয়াশাভেজা সকাল, শিশিরসিক্ত ঘাস, মহানন্দার শান্ত জলধারা, কাশফুলের দোলা আর সারি সারি সবুজ চা-বাগান—সব মিলিয়ে প্রকৃতির নিজস্ব রূপে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

গত বৃহস্পতিবার থেকেই তেঁতুলিয়া শহর ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। পর্যটকবাহী বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে মুখর হয়ে ওঠে সড়কগুলো। স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দেখা দিয়েছে ব্যস্ততা।

15ae35b6-59dd-4b1a-854e-536c7b8b770b

অনেক পর্যটক কাঙ্ক্ষিত আবাসন না পেয়ে খোলা মাঠে তাঁবু টানিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। কেউ আবার জোছনামাখা রাতে গান, আড্ডা ও নাচে মেতে উঠছেন।

রংপুর থেকে আসা পর্যটক প্রান্ত বলেন, “বন্ধুদের নিয়ে গতকাল ট্রেনে করে তেঁতুলিয়ার কাঠেরবাড়ি গেস্ট হাউসে ছিলাম। আজ ভোরে এসে প্রচুর কুয়াশার কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চা-বাগান আমার বেশ ভালো লেগেছে।”

স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী রানা বলেন, “কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা মানুষগুলো এখন আমাদের কাছে পরম আত্মীয় হয়ে গেছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসে, হাসে, গল্প করে—এ যেন এক ধরনের মায়া, আপনজনের চেয়েও আপন।”

প্রতি বছর অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় প্রকৃতির রূপও হয়ে ওঠে অনন্য। সীমান্ত নদী মহানন্দার স্বচ্ছ প্রবাহ, কাশবনের দোল খাওয়া সৌন্দর্য, সবুজ চা-বাগান আর নির্মল আকাশ মিলিয়ে তেঁতুলিয়া পরিণত হয় প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে।

জানা যায়, হিমালয়ের পূর্বাংশে নেপাল ও ভারতের সিকিম সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার বা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। এভারেস্ট ও কে-টু-এর পর এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। স্বচ্ছ আকাশে তেঁতুলিয়া থেকে বরফঢাকা এই পর্বতশৃঙ্গের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগের সুযোগ মেলে।

শুধু দিনের সৌন্দর্য নয়, রাত নামলেও তেঁতুলিয়ার আকর্ষণ কমে না। মহানন্দার তীর কিংবা উঁচু স্থান থেকে রাতের আঁধারে ভারতের দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি বসতির আলোর ঝলকানি দেখা যায়। দূরের পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই আলোকরেখা পর্যটকদের মনে তৈরি করে অন্যরকম রোমাঞ্চ।

IMG_1790658284566

তেঁতুলিয়া প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, শুক্রবার তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ২৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৩ থেকে ২৪ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে।

জিতেন্দ্র নাথ রায় বলেন, “বর্তমানে শরৎকাল চলছে। শীত আসতে আরও প্রায় এক মাস বাকি থাকলেও হেমন্তের শুরুতেই রাত থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের জনপদ কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকছে। এর পেছনে মৌসুমি বায়ুর নিষ্ক্রিয়তা, বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি, দিনের বেলায় মেঘমুক্ত আকাশ ও তাপদাহসহ আবহাওয়াগত বিভিন্ন কারণ রয়েছে। বর্তমানে কুয়াশা ও হালকা মেঘের আচ্ছাদনে উত্তর আকাশ ঢাকা থাকায় পর্বতশৃঙ্গটির দেখা মিলছে না।”

প্রতিনিধি/এসএস