জেলা প্রতিনিধি
০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৯ এএম
জন্ম ও বাসস্থান কুড়িগ্রাম হলেও এসএসসি পাস করেছেন পটুয়াখালীর নিভৃত এক গ্রামের বিদ্যালয় থেকে। পরে ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে ইংরেজিতে সম্পন্ন করেন অনার্স-মাস্টার্স। সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়েই শিক্ষকতা করছেন ২৬ বছর ধরে।
শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও ঢাবিতে নিজের রোল নম্বর, হল পরিচিতি কার্ডসহ অনেক তথ্যই অজানা তার। ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্স করলেও শেক্সপিয়ারের একটি উপন্যাসের নামও জানেন না তিনি।
কথা হচ্ছে রংপুর সদর উপজেলার শ্যামপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. কাজল মাহমুদ সম্পর্কে। তার বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে। নিজের নাম পাল্টে অন্যের নাম ও সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তিনি চাকরি করছেন। প্রভাষক থেকে হয়েছেন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ। অভিনব এই জালিয়াতির ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।
মাউশির তদন্ত সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়া পৌর এলাকার ছোবাহান মাস্টারের ছেলে কাজল মাহমুদ। তিনি যশোর শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ১৯৮৯ সালে খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে১৯৯১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে ১৯৯৪ সালে অনার্স ও ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য সমস্ত একাডেমিক সনদ ইংরেজি ভার্সনে রূপান্তরিত করার জন্য শিক্ষাবোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে জানতে পারেন যে, ২০০২ সালের শুরুর দিকে হারানো বিজ্ঞপ্তি, অপরিচিত ব্যক্তির ছবি ও ঠিকানা দেখিয়ে ডুপ্লিকেট সনদ উত্তোলন করা হয়েছে। ডুপ্লিকেট ওই সনদগুলোতে মো. কাজল মাহমুদ, পিতা- মো. ছোবাহান মাস্টার উল্লেখ করা হয়েছে। যা তার নিজের ও বাবার নামের সঙ্গে মিলে যায়।
এ অবস্থায় প্রকৃত কাজল মাহমুদ তার নাম আংশিক পরিবর্তন ও সনদ ইংরেজি ভার্সনে রূপান্তরিত করার জন্য আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে শিক্ষাবোর্ডের সনদ সংশোধন কমিটির সুপারিশে ২০০২ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্সের সনদ পরিবর্তন করা হয়। যেখানে মো. কাজল মাহমুদ, পিতা- ছোবাহান মাস্টারের পরিবর্তে রাফসান মাহমুদ ও পিতা-আব্দুস ছোবহান হিসেবে সংশোধিত হয়।
পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্রেও নিজের নাম রাফসান মাহমুদ, পিতার নাম আব্দুস ছোবহান এবং মায়ের নাম লুৎফুন নিহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা হিসেবে রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের কাফরুল উল্লেখ করা হয়েছে।
এ দুই ব্যক্তির একাডেমিক সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে দেখা যায়, কাজল মাহমুদ ওরফে রাফসান মাহমুদের মাধ্যমিকের রোল নম্বর ২৪৬, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৭৬০৫৮ এবং সেশন ১৯৮৭-৮৮।
অন্যদিকে শ্যামপুর ডিগ্রি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদেরও একাডেমিক সনদের রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং সেশন একই। উচ্চ মাধ্যমিকের সনদেও দুজনের রোল ২৮৫৬৯। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রে কাজল মাহমুদের জন্ম তারিখ ৩১ মার্চ ১৯৭৪ উল্লেখ করা হয়েছে, যা রাফসান মাহমুদেরও একই জন্ম তারিখ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধ্যক্ষ মো: কাজল মাহমুদের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলাধীন পাঁচগাছি ইউনিয়নে। তার প্রকৃত নাম ফারুক হোসেন। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা হিসেবে তিনি রংপুর সিটি করপোরেশনের কামারপাড়া, নিজের নাম মো. কাজল মাহমুদ, পিতা- মো. ছোবহান মাস্টার এবং মায়ের নাম মোছা. ফাতেমা বেগম উল্লেখ করেছেন।
কর্মজীবনের প্রথমে তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ মহিলা কলেজে ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রভাষক (ইংরেজি) হিসেবে যোগদান করেন। পরে ২০০০ সালের মে মাসে এমপিওভুক্ত হন। সেখানে তিনি ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি কাউনিয়া মহিলা কলেজে ২০১৪ সালের ১৪ আগস্ট উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।
অধ্যক্ষ মো. কাজল মাহমুদের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা যায়, এসএসসির সনদ অনুযায়ী তিনিও যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কাজল মাহমুদ বলেন, তার সনদটাই সঠিক। রাফসান মাহমুদ তার সনদ জালিয়াতি করেছেন। এ বিষয়ে তিনি আইনি পদক্ষেপ নেবেন। কারণ, রাফসান মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি তার সনদগুলো নিজের বলে প্রচার করছেন। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
অধ্যক্ষ আরও জানান, তার ২৬ বছরের চাকরি জীবনে তিনটি মন্ত্রণালয় অডিট সম্পন্ন হয়েছে। এসব অডিটে কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্যামপুর ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হয়ে পটুয়াখালী থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, রংপুর অঞ্চল থেকে এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে যদি অধ্যক্ষের জালিয়াতি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়ার সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই কলেজের অধ্যক্ষের জালিয়াতির তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অধ্যক্ষের কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হয়েছে। তিনি ইংরেজি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করলেও শেক্সপিয়ারের একটি উপন্যাসের নাম বলতে পারেননি। তার কাছে শুধু সনদ কয়েকটি ছাড়া মার্কশিট, প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড কিছুই পাওয়া যায়নি।
এছাড়া রাফসান মাহমুদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তার একাডেমিক সনদ জালিয়াতি করা হয়েছে, এজন্য তিনি নাম পরিবর্তন করেছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।
প্রতিনিধি/এএইচ