জেলা প্রতিনিধি
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
জন্মদাতা বাবাকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ছেলে পলাশ হাওলাদারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বরিশালের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সোহেল আহমেদ।
একই মামলায় অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত ছেলে পলাশ হাওলাদার পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডিত পলাশ হাওলাদার বরিশালের উজিরপুর উপজেলার পরমানন্দ সাহা গ্রামের মৃত আলী আকবর হাওলাদারের ছেলে। মামলার অন্য আসামি কাওসার হাওলাদার ও মিজান হাওলাদারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদী নিহত আলী আকবর হাওলাদারের আরেক ছেলে মো. শহিদ হাওলাদার এজাহারে উল্লেখ করেন, তাদের মা দীর্ঘদিন আগে মারা যান। তার বাবা একজন দিনমজুর ছিলেন। শহিদের মেঝ ভাই পলাশ সাকরাল গ্রামের ইসমাইল হোসেনের মেয়ে জ্যোৎস্না আক্তারকে বিয়ে করে প্রায় এক বছর ঘর সংসার করেন। পরবর্তীতে পরিবারের সবার অমতে পলাশ ভদ্র গ্রামের শাহ আলম রাঢ়ীর মেয়ে সুইটি বেগমকে দ্বিতীয় বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রায়ই পলাশ তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে উঠতে চাইলে তাদের বাবা বাধা দিতেন। এ নিয়ে বাবা আলী আকবরের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত ছিলেন পলাশ। এরই মধ্যে পলাশের প্রথম স্ত্রী জ্যোৎস্না বেগমকে কোনো প্রকার ভরণপোষণ না দেওয়ায়, তিনি পলাশের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় পলাশ বেশ কিছুদিন কারাভোগ করে জামিনে বের হন।
মামলার বাদী বলেন, ওই মামলা দায়েরের পেছনে পলাশ তার বাবা আলী আকবরের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। ফলে কারাভোগের প্রতিশোধ নিতে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। এ নিয়ে ২০১০ সালের ২ মে সন্ধ্যার পর তাদের বাবার সঙ্গে পলাশের তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়।
ওই দিন দিবাগত মধ্যরাতে পলাশসহ অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন ব্যক্তি তার ঘুমন্ত বাবাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরদিন (৩ মে) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে প্রতিবেশী আলমগীর হাওলাদার তাদের বাবাকে পাশের একটি ধানক্ষেতে হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা এবং চোখ-মুখ গামছা দিয়ে বাঁধাসহ রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তিনি তাদের বাড়িতে খবর দেন।
পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মুমূর্ষু অবস্থায় তাদের বাবা আলী আকবর হাওলাদারকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে উজিরপুর উপজেলা হাসপাতালে এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপর নিহতের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, অ্যাম্বুলেন্সযোগে আলী আকবরকে বরিশালে নেওয়ার সময় পলাশ অ্যাম্বুলেন্সে উঠে তার বাবার গায়ে হাত দিতে চান। তখন আলী আকবর পলাশের হাত সরিয়ে দেন। তবে সে সময় তিনি মুখে কোনো কথা বলতে পারেননি। এতে বাদীর সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে বাদীর ছোট ভাই সবুজের কাছ থেকে ওইদিন রাতে পলাশ ও তার সহযোগীরা বাবাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনে তিনি থানায় গিয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২৫ মার্চ উজিরপুর মডেল থানার তৎকালীন ওসি সুকুমার রায় আদালতে তিনজনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন। মামলায় একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বুধবার বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন।
প্রতিনিধি/ এজে