নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
গ্যাসের তীব্র সংকট এবং বর্ষার কারণে কয়লা পরিবহন ও সরবরাহে বিঘ্নের মধ্যে বাংলাদেশ কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বিদ্যুৎ–সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টের শুরুতে ঘণ্টায় প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ বিনিয়োগগুলোর একটি বাঁশখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় অবস্থিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ার-১। এস আলম গ্রুপ, চীনের সেপকোথ্রি ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও এসটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের অংশীদারত্বে নির্মিত এই প্রকল্পে আনুমানিক ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এটি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ একক শিল্প বিনিয়োগ।
প্রকল্পটির অর্থায়নে ব্যাংক অব চায়নার নেতৃত্বে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি সিন্ডিকেটেড ঋণ নেওয়া হয়। এতে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক রপ্তানি ঋণ সহায়তাকারী সংস্থা হিসেবে যুক্ত ছিল।
২০২৩ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। একই বছরের অক্টোবরের মধ্যে ৬৬০ মেগাওয়াট করে দুই ইউনিটই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর জন্য এটি ছিল বড় ধরনের প্রকৌশল ও অর্থায়ন–সাফল্য।
আধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করা হয়। নিজস্ব গভীর সমুদ্রের জেটির মাধ্যমে কয়লা খালাসের সুবিধা থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পাশাপাশি দেশের জ্বালানি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতাও কিছুটা বেড়েছে।
এই প্রকল্পের বাণিজ্যিক শর্তও মূলত ভোক্তাদের কথা বিবেচনায় রেখে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে অনুমোদিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় এসএস পাওয়ার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ দশমিক ৬১ টাকা দরে বিক্রি করে।
এটি এমন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখন গ্রিডের ঘাটতি পূরণে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটে বিপিডিবির দৈনিক এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রায় ৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ফলে বাঁশখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ কোনো তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করতে পারলে সরকারি ব্যয় কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল্যঝুঁকি থেকেও বাংলাদেশ কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।
তবে গ্রিডে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবদান ধরে রাখার পথ সহজ ছিল না। ২০২৩–২৪ সালে দেশের ডলার–সংকটের কারণে কয়লা আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনও কমে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর মূল স্পনসর গ্রুপের আর্থিক সমস্যার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তারপরও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একাধিকবার উৎপাদনে ফিরেছে। জ্বালানি সরবরাহ ও পাওনা পরিশোধ নিয়ে সমঝোতার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারের হার প্রায় ৭৫ শতাংশে ফিরে আসে।
২০২৬ সালেও একটি ইউনিট পুনরায় চালুর অপেক্ষায় থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায় ৫৬০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিপিডিবির কাছে কোম্পানিটির পাওনা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এই বিপুল বকেয়া অর্থপ্রবাহে চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নতুন কয়লার চালান আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তারপরও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারাবাহিক উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের তিনটি বড় কয়লাভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—এসএস পাওয়ার, আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আরএনপিএল—মিলে তাদের মোট ৪ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। একই সময়ে দৈনিক লোডশেডিং ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, চলতি দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি কমাতে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারলে একাই বর্তমান গড় ঘাটতির প্রায় অর্ধেক পূরণ করতে পারে।
এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। নির্মাণ ও পরিচালনার পর্যায়ে এটি চট্টগ্রামের তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি উপকূলীয় উপজেলায় হাজারো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) অংশীদারদের মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতা ও জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি বন্দর ও জেটি অবকাঠামো স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে এবং স্থানীয় সরকারের জন্যও একটি স্থায়ী রাজস্বভিত্তি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা যেখানে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য অপরিহার্য মনে করেন, সেখানে এসএস পাওয়ারের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি বিদ্যুৎ শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এআর