জেলা প্রতিনিধি
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১০ পিএম
পাহাড়ে জুমের ফলন ভালো হলেও প্রতিবছরই কমছে জুম চাষের পরিমাণ। ফল ও সেগুনবাগান সম্প্রসারণ এবং জুমের জমির সংকোচনসহ নানা কারণে ঐতিহ্যবাহী এই চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক চাষি। তবে এখনো জুমে ধান, আদা, হলুদ, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, তিল ও মরিচসহ নানা ফসল ফলিয়ে পরিবার ও জীবিকার চাহিদা মেটাচ্ছেন পাহাড়ের মানুষ।

স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পাহাড়ের ঢালে জুমের জমিতে বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করেন তারা। তিন-চার মাস পর আশ্বিনের শুরুতে ধান পাকতে শুরু করে। মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হয় পাকা ধান ঘরে তোলার উৎসব, যা চলে প্রায় মাসজুড়ে।
ধৈইল্যাতলীর জুমচাষি দুলাল ত্রিপুরা (৬১) বলেন, এবার জুমে ধান ছাড়াও আদা, হলুদ, চিনাল, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, আমিলা, তিল ও ছিকন মরিচ আবাদ করেছি। ধান তোলা শুরু হয়েছে।

তেরাংতৈকালাই (রিসাং) ঝরনা এলাকার জুমচাষি সুনীল ত্রিপুরা জানান, দেড় আড়ি ধানের পাশাপাশি মারফা, ভুট্টা, তিল ও কলা লাগিয়ে বেশ ভালো ফলন পেয়েছেন তিনি।
দীঘিনালা উপজেলার সীমানাপাড়ার কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, আগে আমাদের দুর্গম এলাকায় অনেকেই জুম চাষ করতেন। এখন সেখানে বিভিন্ন ফলের বাগান, সেগুনবাগান ও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। ফলে জুমের জমির পরিমাণ কমে গেছে। সামনে এর কারণে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার দুর্গম হাচুকপাড়ার জুমচাষি দুলাল ত্রিপুরা, বিক্রম ত্রিপুরা ও অগ্নিলাল ত্রিপুরা জানান, মাটিতে আগের মতো উর্বরতা না থাকায় এবং প্রতিবছর একই জায়গায় চাষ করায় এখন আগের মতো ফলন পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে এখন জুমে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে, অথচ একসময়ে এসবের কোনো প্রয়োজন হতো না।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৫০ হেক্টর এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। স্থানীয় চাষিদের মতে, টিলায় স্থায়ী বাগান ও বসতি গড়ে ওঠায় ভবিষ্যতে জুমের জমি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীঘিনালার নয়মাইল এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার গণেশ ত্রিপুরা বলেন, বাগান বাড়ার কারণে প্রতিবছর জুম চাষ কমছে। জুমচাষিরা সাধারণত সরকারি কৃষিঋণও পান না। সরকার যদি ঋণসহায়তা দিতো, তবে চাষিরা আরও উৎসাহিত হয়ে আবাদ বাড়াতে পারতেন।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার শান্তিময় ত্রিপুরা জানান, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জুম চাষ হয় আলুটিলা হৃদয়মেম্বার পাড়া এলাকায়। এখানকার প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে তিনশ পরিবার জুম চাষের সঙ্গে জড়িত। মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়া এবং জুমের জায়গায় আম ও সেগুনবাগান গড়ে ওঠায় চাষের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। দুর্গম এলাকার যেসব মানুষ জুম চাষের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, তারা চাষ করতে না পারলে বড় ধরনের খাদ্যসংকটে পড়বেন।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জেলায় বিগত কয়েক বছর ধরেই জুম চাষের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। কৃষি বিভাগ নানাভাবে চাষিদের সহায়তা দিয়ে জুম চাষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিনিধি/টিবি