জেলা প্রতিনিধি
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০১ পিএম
ধর্ষণ মামলায় বিচার না চেয়ে মামলার আসামিকে স্বামী হিসেবে পেতে ঝালকাঠি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হট্টগোল করেছেন বাদী রুনু আক্তার (৩০)। একপর্যায়ে আসামির সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা না করলে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেন তিনি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঝালকাঠি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটির যুক্তিতর্ক শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শরীফ মোহাম্মদ সানাউল হক বাদীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে তার হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মো. আককাস সিকদার ও আসামিপক্ষের আইনজীবী মল্লিক মুহা. নাসির উদ্দিন কবীর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। শুনানির সময় বারবার হট্টগোল করায় বিচারক, আইনজীবী ও নারী পুলিশ সদস্যরা বার ডকে দাঁড়িয়ে থাকা রুনু আক্তারকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এ সময় বিচারক রুনু আক্তারকে ধৈর্য ধরতে বলেন। তিনি বলেন, বিচারে আসামির অপরাধ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, আবার সাজাও হতে পারে।
এরপর রুনু আক্তার বিচারককে বলেন, আসামির সাজা হলে তাকেও ফাঁসি দিতে হবে। তিনি আসামির শাস্তি চান না, তাকে চান এবং তার চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
এ সময় বিচারক তাকে বলেন, আসামিকে বিয়ে করার জন্য আদালত বাধ্য করতে পারবে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারবে।
এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে রুনু আক্তার কাজি ডেকে আসামির সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবি করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আসামি আল-আমিনের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা না করলে তিনি বিষ খেয়ে বিচারকের সামনে আত্মহত্যা করবেন।
ট্রাইব্যুনালের পিপি মো. আককাস সিকদার বলেন, রোববার নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা নম্বর ১২৫/২৩-এর যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য ছিল। মামলার বাদী রাজাপুর থানার জগন্নাথপুর গ্রামের রুহুল আমিনের মেয়ে রুনু আক্তার। তিনি মনির হোসেনের সাবেক স্ত্রী। মামলার আসামি রাজাপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. আল-আমিন মোল্লা। তিনি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার উত্তর মুরাদিয়া গ্রামের মো. ইউনুচ মোল্লার ছেলে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং মিথ্যা বিয়ের নাটক সাজিয়ে আল-আমিন তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন—এ অভিযোগে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মামলা করেন রুনু আক্তার।
২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর আল-আমিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় বাদী, তার নাবালক ছেলে মুবিন হোসেনসহ চারজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
পিপি আককাস সিকদার বলেন, সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে আরও দুজন সাক্ষী দেশে নেই বলে বাদী নিজেই ট্রাইব্যুনালকে জানান এবং তাদের সাক্ষ্য না নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করার আবেদন করেন। সাক্ষীদের পরোয়ানা তামিলকারী পুলিশও ওই দুজন সাক্ষীর বিষয়ে একই প্রতিবেদন দেয়।
তিনি বলেন, সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার পর আসামিকে পরীক্ষার সময় থেকেই বাদী আল-আমিনের সঙ্গে তার বিয়ে ও কাবিননামার দাবি করতে শুরু করেন। রোববার যুক্তিতর্ক শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্ক শুরু করলে তিনি তার ওপরও চড়াও হন এবং উচ্চস্বরে হট্টগোল করতে থাকেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী নাসির উদ্দিন কবীর বলেন, যুক্তিতর্ক শুনানির সময় রুনু আক্তার একাধিকবার কর্কশ ভাষায় তার ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে তিনি বিচারককে হুমকি দিয়ে বলেন, আসামির সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তা না হলে রায়ের দিন ট্রাইব্যুনালে সবার সামনে তিনি আত্মহত্যা করবেন।
পিপি আককাস সিকদার আরও বলেন, শুধু মৌখিকভাবে নয়, রুনু আক্তার লিখিত দরখাস্ত দিয়েও আসামির সঙ্গে তার বিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন। সেখানে তিনি আসামি আল-আমিনকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। অন্যথায় নিজে এবং আগের স্বামীর সন্তানকে নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সামনে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আককাস সিকদার বলেন, রুনু আক্তার তার ব্যক্তিগত চেম্বারেও গিয়ে তাকে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল-আমিনকে স্বামী হিসেবে না পেলে কাউকে ছাড়বেন না এবং নিজের জীবন দিয়ে সবাইকে ফাঁসিয়ে দেবেন।
মামলার বাদী রুনু আক্তার বলেন, তিনি আল-আমিনকে স্বামী হিসেবে ফিরে পেতে ধর্ষণ মামলা করেছেন। তাকে সাজা দিয়ে তার কী লাভ? তিনি যেকোনোভাবে আল-আমিনকে চান।
প্রতিনিধি/এআর