Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ভেজালের দাপটে সুনাম হারাচ্ছে নাটোরের ২০০ বছরের কাঁচাগোল্লা

জেলা প্রতিনিধি

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম

কাঁচাগোল্লা নাটোরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই মিষ্টি আজও নাটোরের মিষ্টির তালিকায় শীর্ষে। শুধু নাটোরেই নয়, সারা দেশেই এর চাহিদা রয়েছে।

প্রাচীন এই মিষ্টি শুধু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী কাঁচাগোল্লার বিকৃতি ঘটিয়ে এর সুনাম নষ্ট করছেন। এতে ক্রেতারা আসল কাঁচাগোল্লার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০২৩ সালে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও কাঁচাগোল্লার মান উন্নয়ন ও সংরক্ষণে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ তেমন নেই। কর্মশালা ও অভিযানের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

জিআই স্বীকৃতি

নাটোর জেলা প্রশাসনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর (ডিপিডিটি) কাঁচাগোল্লাকে দেশের ১৭তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি নাটোরের একমাত্র জিআই পণ্য।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কাঁচাগোল্লার সঙ্গে নাটোরের মানুষের আবেগ, শ্রম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। তাই এর স্বাদ ও গুণগত মান সংরক্ষণ করা জরুরি।

2024-11-09-672f92418bb2c

ভেজালে নষ্ট হচ্ছে মান

কাঁচাগোল্লার গুণগত মান নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ ভেজাল ও বিকৃতিকরণ। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু ব্যবসায়ী নিম্নমানের উপকরণ মিশিয়ে কাঁচাগোল্লা তৈরি করছেন।

নাটোরের বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন পরিবহনে ময়দা দিয়ে তৈরি লাড্ডুকে কাঁচাগোল্লা হিসেবে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব মিষ্টির সঙ্গে প্রকৃত কাঁচাগোল্লার কোনো মিল নেই। ফলে ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি বিকৃত কাঁচাগোল্লা খেয়ে আসল মিষ্টি সম্পর্কে ভুল ধারণা পাচ্ছেন। এতে মানসম্পন্ন কাঁচাগোল্লার সুনাম ও ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ।

9c892792-57c8-4f73-89d9-72546d40d577

কাঁচাগোল্লার মান রক্ষায় জেলা প্রশাসন বছরে একবার উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করে। তবে মানসম্পন্ন কাঁচাগোল্লা উৎপাদনে কার্যকর ও নিয়মিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

প্রতিদিন বিক্রি প্রায় ১ হাজার কেজি

নাটোর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় শতাধিক মিষ্টির দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। তবে কাঁচাগোল্লাকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান বা দোকান গড়ে ওঠেনি। নাটোরে আসা পর্যটক ও ক্রেতারা বিভিন্ন মিষ্টির দোকান থেকে এটি সংগ্রহ করেন। অনলাইনেও কাঁচাগোল্লার বিক্রি তুলনামূলকভাবে কম।

শহরের নিচাবাজারের মৌচাক মিষ্টান্ন ভান্ডার, লালবাজারের পুরোনো ও প্রসিদ্ধ জয়কালী বাড়ি মিষ্টান্ন এবং রেলস্টেশনের ঘোষ মিষ্টান্ন দোকানে কাঁচাগোল্লার বিক্রি বেশি।

nator1445495078

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার কেজি কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৬৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ টাকার কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

কর্মসংস্থানে অবদান

কাঁচাগোল্লা উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে নাটোরের শত শত পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। বাড়ি বাড়ি থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ, দুধ থেকে ছানা তৈরি এবং সেই ছানা দিয়ে কাঁচাগোল্লা তৈরির প্রতিটি ধাপেই মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কাঁচাগোল্লার উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর অবদান আরও বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

954fac64-9af9-49af-bb16-119e70d7517b

রফতানির সম্ভাবনা থাকলেও উদ্যোগ নেই

সারা দেশে পরিচিতি থাকলেও কাঁচাগোল্লাকে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার তেমন উদ্যোগ নেই। উদ্যোক্তা তৈরি না হওয়ায় এর বাণিজ্যিক প্রসারও সীমিত বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, কাঁচাগোল্লা রফতানিমুখী করা গেলে এর চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এজন্য সরকারি প্রণোদনা, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং মানসম্পন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও ব্যবসায়ী নেতাদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

কেমন এই কাঁচাগোল্লা

কাঁচাগোল্লা দেখতে গোলাকার বা লম্বাটে—এমন ধারণা অনেকের থাকলেও প্রকৃত কাঁচাগোল্লার আকৃতি তেমন নয়। এটি ঝরঝরে ও হালকা রসালো। দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় এই মিষ্টি।

55-20230603211852

দেশ-বিদেশে খ্যাতি

জনশ্রুতি অনুযায়ী, রানি ভবানীর রাজত্বকালে কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় নাটোরে মিষ্টির দোকান ছিল কম। কাঁচাগোল্লার পাশাপাশি অবাক সন্দেশ, রাঘবশাহী, চমচম, রাজভোগ, রসমালাই ও পানিতোয়া মিষ্টিও তৈরি হতো। তবে এর মধ্যে কাঁচাগোল্লা বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, রাজা-জমিদারদের অতিথি আপ্যায়নেও কাঁচাগোল্লা পরিবেশন করা হতো। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজপরিবারেও এ মিষ্টি পাঠানো হতো বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে বাণিজ্যিকভাবে এটি এখনো বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়নি।

eeeeeeeeeeeeeeeeeeeeeeee-2303300741

কাঁচাগোল্লার ইতিহাস

কাঁচাগোল্লার উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত একটি জনশ্রুতি রয়েছে। প্রায় আড়াই শ বছর আগে নাটোর শহরের লালবাজারে মধুসূদন দত্তের মিষ্টির দোকান ছিল। সেখানে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই মণ দুধের ছানা দিয়ে রসগোল্লা, পানিতোয়া, চমচমসহ বিভিন্ন মিষ্টি তৈরি করা হতো। ১০ থেকে ১৫ জন কারিগর কাজ করতেন ওই দোকানে।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, একদিন মিষ্টি তৈরির কারিগরেরা না আসায় বিপাকে পড়েন মধুসূদন দত্ত। এত ছানা দিয়ে কী করবেন, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান তিনি। পরে ছানা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে তাতে চিনির রস দিয়ে জ্বাল দেন। কয়েক ঘণ্টা পর সেই ছানা খেয়ে তিনি ভিন্ন স্বাদ পান। এরপর কাঁচা ছানা দিয়ে তৈরি হওয়ায় মিষ্টিটির নাম দেওয়া হয় ‘কাঁচাগোল্লা’।

ধীরে ধীরে মিষ্টিপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কাঁচাগোল্লা। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, রানি ভবানীও এই মিষ্টি পছন্দ করতেন এবং রাজপ্রাসাদে অতিথি এলে কাঁচাগোল্লা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো।

images

কমে গেছে বিক্রি, কারিগরও সংকটে

লালবাজারের জয়কালী বাড়ি মিষ্টির দোকানের স্বত্বাধিকারী রবীন্দ্রনাথ কুণ্ড বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে আমি এই দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি করে আসছি। এর আগে আমাদের বাপ-দাদারা কাঁচাগোল্লা তৈরি করতেন। কাঁচাগোল্লা নাটোরের রানি ভবানী খুব পছন্দ করতেন। রাজপ্রাসাদে কোনো অতিথি এলে এই কাঁচাগোল্লা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশেও কাঁচাগোল্লার বেশ পরিচিতি রয়েছে। বহু দূর থেকে ক্রেতারা আমাদের দোকানে কাঁচাগোল্লা নিতে আসেন। কাঁচাগোল্লা এখনো নাটোরের ঐতিহ্য বহন করছে। একসময় আমরা প্রতিদিন কয়েক মণ কাঁচাগোল্লা বিক্রি করেছি। এখন দিনে এক মণও বিক্রি হয় না। বর্তমানে মানসম্পন্ন কাঁচাগোল্লা তৈরির কারিগর খুবই কম। আমরা সেই সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’

image-234624-1758005469

নাটোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নাফ বলেন, ‘আমাদের দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন এগিয়ে না এলে কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নয়। তাই কাঁচাগোল্লাকে রফতানিমুখী করতে প্রশাসনকে আগে এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার চাইলে কাঁচাগোল্লা বিদেশে রফতানির উদ্যোগ নিতে পারে। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রতিনিধি/এসএস