জেলা প্রতিনিধি
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২১ পিএম
কালো রঙের ধান। কাছে গেলে ধানের শীষেও চোখে পড়ে ভিন্নতার ছাপ। এমন ধান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন মানুষ। কেউ কৌতূহল নিয়ে দেখছেন, কেউ আবার আগাম বীজের জন্য যোগাযোগ করছেন। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে ভিয়েতনাম জাতের ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান চাষ করে এখন সবার নজর কেড়েছেন তরুণ কৃষক রকিবুল ইসলাম। তার চোখেমুখে এখন রঙিন স্বপ্ন।
বোচাগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর নাফানগর ইউনিয়নের দিঘড়ী গ্রামের আমিনুল হকের ছেলে রকিবুল ইসলাম। সেতাবগঞ্জ বাজারের একটি কসমেটিকসের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। এর পাশাপাশি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা রকিবুল এবার নিজ উদ্যোগে ৩৩ শতক জমি ইজারা নিয়ে শুরু করেছেন ব্ল্যাক রাইসের চাষ।
এই ধান চাষের শুরুটাও বেশ ভিন্ন। অনলাইনের মাধ্যমে ৪৫০ টাকা দিয়ে এক কেজি ব্ল্যাক রাইসের চাল কিনে ভাত খাওয়ার পরই তার মনে আগ্রহ তৈরি হয় ধানটি চাষ করার। এরপর অনলাইনে ১ হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে দুই কেজি বীজ সংগ্রহ করেন। বীজতলায় তা বপনের পর শুরু করেন নতুন জাতের ধান উৎপাদনের প্রস্তুতি।
প্রথমে নিজের পৈত্রিক জমিতেই এই ধান চাষ করতে চেয়েছিলেন রকিবুল। কিন্তু তার বাবা আমিনুল হক রাজি হননি। নতুন জাতের ধান হওয়ায় ছেলে ইন্টারনেট দেখে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে—এমনটাই মনে করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বাবার কাছ থেকে জমি না পেয়ে রকিবুল ২৪ হাজার টাকায় ৩৩ শতক জমি ইজারা নেন। গত ৯ জুলাই সেখানে ব্ল্যাক রাইসের চারা রোপণ করেন।
তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রকিবুল বলেন, আগামী ১০ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে ধান কাটা যাবে। ৩৩ শতক জমি থেকে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হিসেবে এই ধানের বাজারমূল্য থাকায় প্রতি মণ প্রায় ১৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে ২০ মণ ধান বিক্রি করতে পারলে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রথমবার ব্ল্যাক রাইস চাষ করেই লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। ফলন ও বাজার ভালো হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে এই ধান চাষ করব।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ ধানের মতোই ব্ল্যাক রাইসের চাষ করা যায়। আলাদা করে অতিরিক্ত সার, পানি কিংবা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক অন্যান্য ধানের মতোই এর পরিচর্যা করতে হচ্ছে তাকে।
রকিবুলের বাবা আমিনুল হক বলেন, প্রথমে ভরসা পাইনি। মনে করেছিলাম ছেলে ইন্টারনেট দেখে পাগলামি করছে। তাই চাইলেও ব্ল্যাক রাইস চাষের জন্য জমি দিইনি। কিন্তু ছেলে জেদ করে জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেছে। এখন দেখে মনে হচ্ছে, ভালোই করেছে। আগামীতে তাকে জমি দেব, সে ব্ল্যাক রাইস চাষ করবে।

রকিবুলের জমিতে ধান দেখে আগ্রহ তৈরি হয়েছে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও। স্থানীয় কৃষক শান্ত, জুয়েল ও আকাশসহ অনেকে এরই মধ্যে রকিবুলের কাছে বীজের জন্য আগাম যোগাযোগ করেছেন।
তারা বলেন, ধান দেখতে অনেক সুন্দর হয়েছে। আমরাও আগামীতে এই ধান চাষ করতে চাই। তাই আগেই বীজের কথা বলে রেখেছি। পাশাপাশি রকিবুলের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে পারব।
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নয়ন কুমার সাহা বলেন, ব্ল্যাক রাইস বা কালো চাল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্থোসায়ানিন, ফাইবার ও আয়রন সমৃদ্ধ। পুষ্টিগুণের আধিক্যের কারণে বিশ্বজুড়ে এটি ‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, ব্ল্যাক রাইস অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি ধান। রোগ প্রতিরোধে সহায়ক এই ধানের চাল উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া গেলে কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্ল্যাক রাইসের চাষ হচ্ছে। বোচাগঞ্জে এবারই প্রথম এ ধানের চাষ হয়েছে। সঠিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করা গেলে এটি লাভজনক হতে পারে। কারণ সৌখিন ক্রেতাদের কাছে এ ধরনের চালের চাহিদা রয়েছে। রকিবুলের সফলতা কামনা করেন তিনি।
প্রতিনিধি/টিবি