Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

মংডুর সঙ্গে সীমিত লেনদেনেও ফিরছে না টেকনাফ বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য

জেলা প্রতিনিধি

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ এএম

নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমার। একসময় এই নদীপথ ধরেই নিয়মিত আসত পণ্যবাহী নৌযান। ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজ ঢুকত টেকনাফ স্থলবন্দরে। পণ্য খালাসে ব্যস্ত থাকতেন শত শত শ্রমিক। ব্যবসায়ীদের আনাগোনা, ট্রাক-ট্রলার ও শ্রমিকদের ব্যস্ততায় সরগরম থাকত কেরুনতলী এলাকা। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নাফ নদীর ঘাটে নোঙর করে থাকা ছোট নৌযান আর সীমিত পরিসরে পণ্য ওঠানামাই যেন টেকনাফ বন্দরের বর্তমান বাণিজ্যের প্রতিচ্ছবি। মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির সংঘাতের জেরে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ ইয়াঙ্গুন–আকিয়াব–টেকনাফের মূল বাণিজ্যপথ। চার মাস আগে মংডুর সঙ্গে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য শুরু হলেও তাতে ফিরছে না বন্দরের আগের কর্মচাঞ্চল্য।

বরং সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বলছে, মংডুর সঙ্গে চালু হওয়া সীমিত বাণিজ্যে আমদানির তুলনায় রফতানিই বেশি হচ্ছে প্রায় চার গুণ।

চার মাসে আমদানি ১,৮২৭ টন, রফতানি ৪,৮০৭ টন:

বন্দর ও কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে মিয়ানমারের মংডু থেকে টেকনাফে ১ হাজার ৮২৭ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মংডুতে রফতানি হয়েছে ৪ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন পণ্য। রফতানি হওয়া এসব পণ্যের মূল্য প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা প্রায় ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৫২১ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এই সময়ে আমদানি থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৮ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৫৩৬ টাকা।

1000459354

বাংলাদেশ থেকে মংডুতে যাচ্ছে আলু, ময়দা, ডিম, প্লাস্টিকের চেয়ার, টাইলস, ছাতা, স্যান্ডেল ও সাইকেলের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য। আর মিয়ানমার থেকে আসছে কাঠ, আইএনসি, কাঁকড়া ও নাইল্যা শুঁটকিসহ বিভিন্ন পণ্য। অর্থাৎ সীমিত পরিসরে বাণিজ্য চালু থাকলেও তা এখনো মূল বাণিজ্যপথ বন্ধ থাকার ক্ষতি পূরণের মতো নয়।

বন্দরে কাজ আছে, নেই আগের ব্যস্ততা:

সম্প্রতি টেকনাফ স্থলবন্দরের কেরুনতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সীমিত পরিসরে পণ্য ওঠানামা চলছে। মংডু থেকে আসা ঘাটে মাছবোঝাই একটি ছোট নৌযান নোঙর করে আছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে মংডুতে পাঠানোর জন্য আলু, কেক, প্লাস্টিকের চেয়ার, ময়দা, ডিম ও টাইলসসহ বিভিন্ন পণ্য ট্রাক থেকে ট্রলারে তোলা হচ্ছে। বন্দরে কাজ চলছে, তবে আগের তুলনায় কাজের পরিমাণ অনেক কম।

টেকনাফ স্থলবন্দরের শ্রমিক নেতা আজগর আলী বলেন, আগে বন্দরে নিয়মিত ৮০০ থেকে ১ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। এখন কাজের সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ১০০ থেকে ২০০ শ্রমিক।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল বাণিজ্য বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও।

তিন বোট আটকের পর বন্ধ হয় মূল বাণিজ্যপথ:

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৬ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফের উদ্দেশে আসার পথে নাফ নদীতে পণ্যবাহী তিনটি বোট আটক করে আরাকান আর্মি। প্রায় ১৬ দিন পর বোটগুলো ছেড়ে দেওয়া হলেও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ইয়াঙ্গুন–আকিয়াব রুটে বাণিজ্য বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার সরকার। এরপর থেকেই টেকনাফ বন্দরের মূল বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানিকারক ওমর ফারুক বলেন, সীমান্ত বাণিজ্যের বড় একটি অংশই ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব বন্দরের সঙ্গে। সংঘাতের কারণে ওই রুট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তার ভাষ্য, মংডুর সঙ্গে সীমিত বাণিজ্য চালু হলেও এতে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বন্দরের মাত্র ১৫ শতাংশ কার্যক্রম সচল:

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট টেকনাফ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব থেকে পণ্য আসা-যাওয়া বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে মংডুর সঙ্গে সীমিত পরিসরে আমদানি-রফতানি চলছে। তার দাবি, বন্দরের মোট কার্যক্রমের প্রায় ১৫ শতাংশ বর্তমানে সচল রয়েছে।

তিনি বলেন, বাণিজ্যপথ বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কমেছে কর্মসংস্থান ও বন্দরের আয়।

1000459353

রাজস্ব আদায়েও বড় ধাক্কা:

বাণিজ্যপথ বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে সরকারি রাজস্ব আদায়েও।

টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান জানান, মংডুর সঙ্গে গত চার মাসের সীমিত বাণিজ্য থেকে সরকার ৮ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৫৩৬ টাকা রাজস্ব পেয়েছে। তবে ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব থেকে পণ্য আসা বন্ধ থাকায় আগের তুলনায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি থেকে সরকার প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল।

পরের অর্থবছরের একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি কমে প্রায় ১১ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসে। ওই সময়ে রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ৯১ কোটি টাকা।

মাহমুদুর রহমান বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

স্বাভাবিক বাণিজ্য চান ব্যবসায়ীরা:

মংডুর সঙ্গে সীমিত বাণিজ্য চালু হওয়ায় টেকনাফ বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ নেই। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এই সীমিত বাণিজ্যে বন্দরের পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য ফেরানো সম্ভব নয়।

1000459352

আমদানি-রফতানিকারক ওমর ফারুক বলেন, সোনালী ব্যাংকে বকেয়া থাকা এফডিডি ড্রাফটগুলো রসুন ও আদা ছাড়া অন্যান্য পণ্যের বিপরীতে খালাসের অনুমতি দেওয়া হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকনাফ বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াবের সঙ্গে বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু করাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

 

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব বন্দর থেকে পণ্য আসা বন্ধ রয়েছে। তবে মংডুর সঙ্গে থেমে থেমে বাণিজ্য চলছে। টেকনাফ স্থলবন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি সচল করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে কবে নাগাদ ইয়াঙ্গুন–আকিয়াব–টেকনাফের মূল বাণিজ্যপথ আবার খুলবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো জানা যায়নি। ফলে নাফ নদীর তীরে টেকনাফ বন্দরের সেই পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য ফেরার অপেক্ষাই দীর্ঘ হচ্ছে।

প্রতিনিধি/টিবি