Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বাসাইলে রডের বদলে বাঁশ: এবার সেই ১০ কোটি টাকার সেতুতে দুদকের অভিযান

জেলা প্রতিনিধি

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

টাঙ্গাইলের বাসাইলে আলোচিত সেই ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় এবার খতিয়ে দেখতে অভিযানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দিনভর দুদক টাঙ্গাইলের কার্যালয় থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন। এ সময় দুদুকের জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী মো. বাসেদ আলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘দুদকের পক্ষ থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এখানে দুর্নীতি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ফুটপাত স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি। এখানে রডের পরিমাণটা কম রয়েছে। রড ততটুকু থাকা দরকার, সেটুকু নেই। সরেজমিনে যে রিপোর্টটি তৈরি করেছি, সেটা আমাদের এক্সপার্ট আছে, ওনারা সরেজমিন প্রতিবেদন দেবে।’

টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার। ছবি- ঢাকা মেইল
টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার। ছবি- ঢাকা মেইল

তিনি আরও বলেন, ‘সরেজমিন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক সত্যতা পেলে আমরা কমিশনকে বিস্তারিতভাবে জানাব। তারপর কমিশন থেকে যে নির্দেশনা দেবে আমার পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করব।’

রডের বদলে বাঁশ প্রসঙ্গে দুদকের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘যে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো আমরা সরেজমিনে দেখতে পাইনি। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে সেগুলো দেখেছি। সেখানে সাটারিং-এ বাঁশের ব্যবহার আমরা দেখেছি।’

এদিকে, এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাসাইল থানার মামলার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে শাহ আলমকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার শাহ আলম (৪৪) রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার মৃত নবুর উদ্দিনের ছেলে।

এ ছাড়াও একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার। ছবি- ঢাকা মেইল
টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার। ছবি- ঢাকা মেইল

সেই সঙ্গে দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি অফিস আদেশ ও চিঠির মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। মামলার প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম।

অপরদিকে, সেতুটি পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।

ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে কমিটি গঠন করা হয়।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে।

টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার। ছবি- ঢাকা মেইল
টাঙ্গাইলের বাসাইলে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার। ছবি- ঢাকা মেইল

জানা গেছে, বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর (বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়ক) ৯০ দশমিক শূন্য ৬ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা।

মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া কাজটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যা তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

এ সময় তারা মোবাইল ফোনে কাজটির ভিডিও ধারণ করে। স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর আবার রাতে কাজ শুরু করে ঢালাই শেষ করা হয়। পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।

এলজিইডির অফিস আদেশে বলা হয়, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর এবং সহকারী ঠিকাদার শাহ আলম তাদের অনুপস্থিতিতে রাতে কাউকে না জানিয়ে ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টিকে ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রতিনিধি/এএম