Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

মাদরাসাপড়ুয়া মাহমুদের অবিশ্বাস্য ফ্রিল্যান্সিং জয়যাত্রা

জেলা প্রতিনিধি

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৬ এএম

নিজের কোনো কম্পিউটার বা স্মার্টফোন ছিল না। বন্ধুর ল্যাপটপে হাতেখড়ি। এলাকার এক বড় ভাইয়ের ফোনে ভিডিও দেখে শেখা আর অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়েও অন্যের ল্যাপটপ দিয়েই কাজের শুরু। পরিবারের সামর্থ্যও ছিল সীমিত। ধান বিক্রির ওয়াদা করে অগ্রিম টাকা নিয়ে ও একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গ্রামের কৃষক বাবাকে কিনে দিতে হয়েছে তার জন্য ল্যাপটপ।

হাজারো সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অনলাইনে কাজ শুরু করেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বেতগাড়া গ্রামের মাহমুদ সরকার। ২০১৮ সালে শুরু করা সেই পথচলায় প্রথম কাজ ছিল ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার বাড়ানো। ফাইভারে পাওয়া নাইজেরিয়ার এক ক্লায়েন্টের ২০ ডলারের কাজ দিয়ে শুরু হয় তার আয়।

এখন তিনি শুধু একাই ফ্রিল্যান্সার নন। ডিজিটাল মার্কেটিং ও অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি নিজের একটি প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করছেন। তার সঙ্গে নির্দিষ্ট বেতনে কাজ করছেন ২২-২৫ জন তরুণ-তরুণী। বিভিন্ন প্রজেক্ট এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।

মাহমুদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার গল্পটা প্রচলিত পথে নয়। কওমি মাদরাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকে অনলাইনে কাজের কথা শুনতেন। এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে প্রথম মাইক্রোসফট ওয়ার্ড শেখেন। পরে অনলাইনে প্রশিক্ষণ নেন।

২০১৮ সালে মাদরাসার পড়াশোনা শেষ করার পর অনলাইনভিত্তিক কাজকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের ল্যাপটপ না থাকায় শুরুতে বন্ধুর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন। অন্যের ফোনে ভিডিও দেখে শেখার পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন প্রশিক্ষণ থেকে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন।

প্রশিক্ষণ শেষ করার প্রায় তিন-চার মাস পর প্রথম কাজ পান ফাইভারে। কাজটি ছিল ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার গ্রোথ। ক্লায়েন্ট ছিলেন নাইজেরিয়ার একজন। পারিশ্রমিক ছিল ২০ ডলার।

প্রথম আয় পাওয়ার মুহূর্তটি এখনো মনে আছে মাহমুদের। ২০ ডলারের অর্ডারটি সম্পন্ন করার পর নিজের ভেতর তার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে যায় এবং কাজের প্রতি চাহিদা বেড়ে যায়। প্রথম ১০০ ডলার সম্পূর্ণ হওয়ার পর টাকা উত্তোলন করে মায়ের হাতে তুলে দেন। 

কারণ এই পথচলার শুরুতে তার পরিবারের অবদান ছিল বড়। নিজের ফোন না থাকায় অন্যের ফোন দিয়ে কাজ শেখা, ল্যাপটপ কেনার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে অর্থের ব্যবস্থা করা সবকিছুই ছিল তার সংগ্রামের অংশ।

মাহমুদ বলেন, শুরুতে তার মা-বাবা তাকে বিশ্বাস করতেন। পড়াশোনায় ভালো ফল করার কারণে পরিবারের কাছে তার ওপর আস্থা ছিল। তাই ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে বড় কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি।

প্রথম ২০ ডলারের কাজ পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মাহমুদকে। ধীরে ধীরে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ বাড়তে থাকে। পরে অ্যাপস ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কাজের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।

বর্তমানে অনলাইন মাকেট প্লেস ফাইভারের ‘টপ রেটেড সেলার’। তার প্রোফাইলে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি রিভিউ। 

কাজে ব্যস্ত ফ্রিল্যান্সার মাহমুদ সরকার। ছবি: ঢাকা মেইল
কাজে ব্যস্ত ফ্রিল্যান্সার মাহমুদ সরকার। ছবি: ঢাকা মেইল

মাহমুদ জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছেন তিনি।

ফাইভারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও অফলাইনে কাজ করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপক (সোসাল মিডিয়া ম্যানেজার) হিসেবে কাজ করছেন। নিয়মিত ক্লায়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৫০ জন বলে জানান তিনি।

মাসিক আয় সাধারণত হাজার ডলারের ওপরে থাকে। কাজের চাপ ও প্রজেক্টের ওপর নির্ভর করে কোনো কোনো মাসে আয় ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্তও আয় হয় বলে জানান মাহমুদ।

মাহমুদের জীবন গল্পেই রয়েছে ভিন্নতা। তিনি তার একার ইনকাম দিয়ে থেমে থাকেননি। তার লক্ষ্য এবং মনে জেদ তৈরি হয়েছিল নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও কাজের সুযোগ করে দেওয়া। সেই লক্ষ্য থেকেই গড়ে তুলেছেন ‘Sarkar Zentrox Lab’ নামে একটি এজেন্সি। বর্তমানে সেখানে ২২ জন ছেলে-মেয়ে কাজ করছেন।

মাহমুদ বলেন, দেশের বাইরে থেকে ডলার আয় করার পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করা তার অন্যতম উদ্দেশ্য। একজন ফ্রিল্যান্সারের ব্যক্তিগত আয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটি ছোট কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ হিসেবেই তিনি নিজের এজেন্সি বানিয়েছেন।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুটা হয়েছিল গ্রামের বাড়ি থেকেই। প্রায় দেড় বছর গ্রামে বসেই কাজ করেন মাহমুদ। কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদুৎসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেতে রংপুরে চলে আসেন তিনি। 

এখন তার নিজের কাজের পাশাপাশি এজেন্সির অন্য কর্মীদের কাজ তদারকি করতে হয়। বিদেশি ক্লায়েন্টদের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করার কারণে অনেক সময় রাতেও কাজ করতে হয়। তিনি জানান, এজেন্সির কাজসহ তাকে দিনে প্রায় ৮-৯ ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে থাকতে হয়। তবে কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারকে সময় দেওয়ার যথেষ্ট চেষ্টা করেন তিনি।

মাহমুদ আরও বলেন, অনেকেই মনে করে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা শুধু আরবি পড়তে পারে; এর বেশি কিছু পারে না- আমি সাধারণ মানুষের এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছি। আমি আমার চেষ্টায় অনলাইন থেকে শিখেছি, অন্যের ফোন চেয়ে নিয়ে শিখেছি।

তিনি বলেন, আমি কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী হওয়ায় অনেকেই অনেক কিছু মনে করেছে। অনেক কিছু বলেছিল। তবে আমি আমার পরিবারকে ধন্যবাদ জানাব যে, তারা আমার উপর ভরসা ও বিশ্বাস করেছে। আমি আমার বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ- তারা আমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছেন। তাই হয়তো আমি আজ এখানে, তারা যদি এমন সুযোগ না দিতেন- হয়তো আজ এখানে আসতে পারতাম না। 

বিশেষ করে আমার বাবা ধান বিক্রি করে আমাকে যে ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিলেন, সেটি আমার জন্য অনুপ্রেরণার মতো কাজ করেছে। যে কাজ শিখতে বা কাজ করতে আগ্রহী আমি তাদের কাজ শেখাতে বা আমার সাথে নিতে প্রস্তুত।

মাহমুদের সাথে কাজ করেন এমন একজন রাসেল মিয়া। তিনি বলেন, আমি মাহমুদ ভাইয়ের এখানে কাজ করছি প্রায় ৫ মাস থেকে। ভাই আমাকে কাজ শেখার পাশাপাশি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকার মতো বেতন দেন আমার পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য। তিনি প্রতিনিয়ত আমাকে বিভিন্ন ধরনের কাজ শেখাচ্ছেন এবং আমি যাতে একাই কাজ করতে পারি, সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। 

জোড়াবাড়ি ইউনিয়নের ৮নং ওয়াডের ইউপি সদস্য জাহিরুল ইসলাম বলেন, আমি যতটুকু জানি- মাহমুদ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান; সে যথেষ্ট কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। তার বাবার সন্তানদের প্রতি অগাধ বিশ্বাসেই মাহমুদ আজ সফল হয়েছে।

প্রতিনিধি/এলএ