জেলা প্রতিনিধি
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০২ পিএম
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা (৪০) বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর)। তার অকাল মৃত্যুতে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের রামহরি পাড়াজুড়ে এখন শোকের আবহ। ছোট সন্তানের অকাল মৃত্যুতে বৃদ্ধ বাবা-মাও শোকে কাতর। ট্রোম্যান খীসার ছোট্ট দুই সন্তান, স্ত্রী আর নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃদ্ধ এই দম্পতির চেহারায় দুশ্চিন্তার চাপ।
জানা গেছে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা (৪০) রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের রামহরি পাড়ার সুবিমল খীসা ও গঙ্গাদেবী চাকমার সন্তান। তিন সন্তানের মধ্যে ট্রোম্যান খীসা সবার ছোট। ট্রোম্যানের এক বড়ভাই ও এক বড়বোন থাকলেও পরিবারের প্রধান উপার্জনশীল ব্যক্তি ছিলেন ট্রোম্যান খীসা।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করা ট্রোম্যান খীসা ২০ বছর বয়সে অর্থাৎ ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। চলতি বছর তার বয়স ৪০ বছর এবং চাকরি জীবন ২০ বছর হলো। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ট্রোম্যান খীসা বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যান, সেখানে তিনি ইএ-৩ কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যান। এক বছরের মিশন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারির শুরুতে দেশে ফেরার কথা ছিল। অথচ ছেলে এর আগেই ফিরবে দেশে, কিন্তু লাশ হয়ে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে রামহরি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ট্রোম্যান খীসার বাড়িতে পাড়া-প্রতিবেশীরা এসেছেন। ট্রোম্যানের বৃদ্ধ মা গঙ্গাদেবী চাকমা (৬৫) সন্তানের শোকে কাঁদছেন। পাড়ার মানুষের তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ছেলেকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ট্রোম্যানের বাবা সুবিমল খীসাও (৬৭)। দুই কন্যার জনক ট্রোম্যান খীসার স্ত্রী শ্রেয়া চাকমা (রূপা) অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছেন। বড় মেয়ের বয়স ৮ বছর আর ছোট মেয়ের বয়স ৫ বছর। ট্রোম্যানের স্ত্রী দুই কন্যা সন্তান নিয়ে চট্টগ্রামে থাকেন নৌবাহিনীর স্টাফ কোয়ার্টারে। স্বামীর নিথরদেহ দেশে ফিরলে যাবতীয় কার্যক্রম শেষে স্বামীকে নিয়ে ফিরবেন রামহরি পাড়ায়।
এদিন সকালে কথা হয় ট্রোম্যান খীসার বাবা-মায়ের সঙ্গে। ট্রোম্যানের মা গঙ্গাদেবী চাকমা জানালেন, আমার ছেলের ডিসেম্বরে মিশন শেষে বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু ছেলে আর মায়ের কাছে ফিরল না। আমার নাতির দুইটাও ছোট৷ কী যে হবে তাদের।
ট্রোম্যান খীসার বাবা সুবিমল খীসা বলেন, বাড়িতে ইন্টারনেট না থাকায় ঘর থেকে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আমাকে দূরে (নেটওয়ার্ক যুক্তস্থানে) গিয়ে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) ছেলের সঙ্গে ভিডিওকলে সবশেষ কথা বলেছিলাম। দুদিন পর রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে ছেলের সঙ্গে আমি ছেলের মোবাইলে কল দিই, কিন্তু সে কল কেউ রিসিভ কতছে না। পরে একজন রিসিভ করে জানায় আমার ছেলে হাসপাতালে ভর্তি আছে। একই সময়ে ফোনে আরও অনেকে ফোন করেন। পরে আমি বড় ছেলেকে ফোন করি ছেলে, এক পর্যায়ে ছেলে আমাকে জানায় ট্রোম্যান আর নেই। ট্রোম্যানের মা আর আমি দুজনই অসুস্থ। আমা বড়ছেলে প্রথমে জানাতে চায়নি। পরে এক পর্যায়ে আমাকে জানায় এবং তার মাকে না জানাতে বলে। অন্যদিকে মৃত্যুর খবর শুনে ওর স্ত্রী মাথাঘুরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। আমি ওইরাতে ঘরে এসে আর ঘুমাতে পারিনি। পরদিন সকালে একসঙ্গে খেতে বসে আমি খেতে পারছিলাম না, তখন ট্রোম্যানের মা দেখল আমি খেতে পারছি না, ওর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তখন সে কান্নাকাটি শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাকে বিষয়টি জানানো হয়।
সুবিমল খীসা আরও বলেন, আমরা শুনেছি ট্রোম্যানের মৃতদেহ দেশে আসতে ২৫ তারিখের মতো লাগবে। এরপর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসবে, চট্টগ্রাম থেকে পরে এখানে আনা হবে। এখান আনতে ২৭-২৮ তারিখও হতে পারে। ছেলের অকাল মৃত্যুতে ট্রোম্যানের মা ভেঙে পড়েছে। আমরা দুজনই অসুস্থ মানুষ। দুই জনের প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকা ওষুধ খরচ লাগে। আমার হার্টে রিং বসানো হয়েছে সব খরচ ট্রোম্যানই দিয়েছে। ট্রোম্যানের স্ত্রী বিধবা হলো, ৫ বছর, ৮ বছর বয়সী দুইটা মেয়ে আছে। এখন তাদেরই কী হবে, কে দেখবে। আমার ছেলে প্রতিমাসে আমাদের ওষুধ খরচ দেয়, এখন কে দেবে। বড় ছেলে তো এসব দেওয়ার মতো বেতন পায় না। এখন আমাদের সবার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রামহরি পাড়ার বাসিন্দা ও ট্রোম্যান খীসার বন্ধু জয়েস খীসা বলেন, আমরা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছি, একসঙ্গে বড় হয়েছি। ছোটকাল থেকেই আমি তাকে ভালো জানি এবং সে খুবই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তার এমন অকাল মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক। ট্রোম্যানকে তার বাবা-মাকে দেখতে হতো। উনাদের দুজনের প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। ট্রোম্যানের বাবা-মা দুজনই ভেঙে পড়েছে। বিলাপ করছে।
ট্রোম্যান খীসার মেসো (খালু) বলেন, ২০০৭ সালে আমার বিয়ের পর থেকেই আমি তাকে দেখে আসছি, সে খুবই কোমল মনের মানুষ। ছোটকাল থেকেই মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। তার এমন কথা শুনে আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। নেটে (ইন্টারনেট) দেখার পর আমি কারো সঙ্গে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। তার বাবাকেও ছেলের কথা বলতে পারিনি। রামহরি পাড়ার বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, ২০ তারিখ বিকেলে ট্রোম্যানের একজন ভাই আমাদের পাড়ার সামনে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে এবং ফোনে কথা বলছে। পরে ফোন কাটার পর আমি জিজ্ঞেস করার পর তিনি জানালেন ট্রোম্যান বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা গেলেন।
বুড়িঘাট ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান প্রমোদ খীসা বলেন, ২০ সেপ্টেম্বর (রোববার) বিকেল বেলায় আমরা ঘটনা জানছিলাম। পুত্রশোকে কাতর হয়ে পড়বে এজন্য তার মাকে আর আমরা এসব কিছুই বলিনি। তাদের আরেকটি বড় ছেলে আছেন, তার আয়-রোজগার কিছুটা কম। ট্রোম্যানই ছিল তাদের ভরসা। চাকরি এখন সোনার হরিণের মতো। তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের খুব ভরসা ছিল। আমি শুনেছি, সুদান থেকে মরদেহ আসতে ৪/৫ দিন লাগবে। আবার এখানে আসতে আরও একদিন লাগতে পারে।
প্রতিনিধি/ এজে