২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
চারদিকে শুধু নদী আর নদী। মাঝে জেগে থাকা ছোট-বড় কয়েকটি চর। কোথাও কাঁচা রাস্তা, কোথাও নদীর বুক চিরে নৌযানই একমাত্র ভরসা। শরীয়তপুরের নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার পদ্মাবেষ্টিত ছয় ইউনিয়নের ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা এমনই বিচ্ছিন্ন।
বিশেষ করে প্রসূতি, শিশু, বৃদ্ধ কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক সময় পথেই ঘটে যায় মর্মান্তিক পরিণতি।
এই পরিস্থিতিতে চরবাসীর জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলায় দেওয়া হয়েছিল দুটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু চালক ও জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলো কার্যত কখনোই চালু হয়নি।
প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি নৌ অ্যাম্বুলেন্সের একটির এখন কোনো হদিস নেই। অন্যটি পড়ে আছে পানিতে ডুবে। ফলে বিপুলসংখ্যক চরবাসীর জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটি কাগজে থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।
নড়িয়ার নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে লঞ্চঘাট এলাকায় কীর্তিনাশা নদীর তীরে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে থাকা স্পিডবোটটি এখন পানিতে ডুবে রয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্সটি স্পিডবোটের কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। এতে ছিল অক্সিজেন সিলিন্ডার, রোগীর শয্যা ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। উদ্দেশ্য ছিল—নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল থেকে সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শাহ জালাল বলেন, তিনি হাসপাতালে যোগ দেওয়ার আগেই নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি নষ্ট হয়ে পড়ে ছিল। তাঁর ভাষ্য, চালক ও জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় এটি কখনোই কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
জাজিরার নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মঙ্গলমাঝি-সাত্তার মাদবর ঘাটে রাখা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেটির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রোমান বাদশা বলেন, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সম্ভবত চুরি হয়ে গেছে। চুরির বিষয়টি জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থাৎ কোটি টাকার কাছাকাছি সরকারি অর্থ ব্যয়ে চরবাসীর জন্য আনা দুটি নৌ অ্যাম্বুলেন্সের একটির অস্তিত্ব এখন পানির নিচে, অন্যটির অবস্থানই অজানা।
চরাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসাসেবার সংকট কতটা ভয়াবহ, তার চিত্র পাওয়া যায় জাজিরার কুন্ডেরচর ইউনিয়নে। ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে গত দেড় বছরে সন্তানসম্ভবা তিন নারী দ্রুত চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
তারা হলেন—শাহিদা আক্তার (২৫), মিতু আক্তার (২২) ও নুরুন্নাহার (২৭)।
ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহেদ আলী মল্লিক বলেন, তার চাচাতো বোন মিতুর সন্তান প্রসবের নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসববেদনা ওঠে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, মিতুর মতো গত দেড় বছরে আরও দুই নারী মারা গেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী পেরিয়ে দ্রুত রোগী পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে অন্তত সংকটাপন্ন রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় কমানো সম্ভব হতো।
কুন্ডেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন ব্যাপারী বলেন, তার ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চরে বসবাস করেন। কয়েক বছর আগে চরবাসীর জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার কথা শুনেছিলেন তিনি। তবে বাস্তবে কখনো সেটি দেখেননি।
চেয়ারম্যান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে প্রসূতি ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নড়িয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে চরআত্রা ও নওপাড়া ইউনিয়নের পুরো এলাকা এবং ঘড়িসার ইউনিয়নের একটি অংশ পদ্মা নদীর মাঝে অবস্থিত। অন্যদিকে জাজিরার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে পূর্ব নাওডোবা, পালেরচর ও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামই নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে।
এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য নৌযান শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটিই হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর একমাত্র পথ। কোনো রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে প্রথমে নৌযান খুঁজতে হয়। এরপর নদী পেরিয়ে ঘাটে পৌঁছে সড়কপথে যেতে হয় হাসপাতালে। ফলে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময়ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা।
শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন রেহান উদ্দিন বলেন, দুটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে—এমন তথ্য তার জানা আছে। তবে বর্তমানে সেগুলো কোথায় এবং কী অবস্থায় আছে, তা তিনি বলতে পারছেন না।
তিনি বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। নৌ অ্যাম্বুলেন্স দুটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে থাকলে সংস্কার করে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চরবাসীর জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে দেওয়া হয়েছিল নৌ অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু চালক ও জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা না থাকায় সেটি চালুই হলো না। একটির এখন কোনো হদিস নেই, অন্যটি পড়ে আছে নদীর পানিতে। যে নৌ অ্যাম্বুলেন্স সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে জীবন বাঁচানোর কথা ছিল, সেটিই আজ সরকারি অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে পড়ে আছে।
পদ্মার বুকে বসবাস করা ৭০-৮০ হাজার মানুষের কাছে তাই প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে— জরুরি চিকিৎসার জন্য দেওয়া সেই নৌ অ্যাম্বুলেন্স কবে সত্যিকার অর্থে মানুষের কাজে আসবে?
এএইচ