Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

সরকারি উন্নয়ন কাজে চাঁদা দাবি, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা

জেলা প্রতিনিধি

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৫ এএম

ফেনীতে সরকারি উন্নয়ন কাজে চাঁদা দাবির ঘটনায় জেলা বিএনপির সদস্য কামরুল হাসান মাসুদের বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক ২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।  রোববার জেলা বিএনপির সদস্য ঠিকাদার সাইফুর রহমান রতন ও সোনাগাজী উপজেলা যুবদলের সাবেক প্রচার সম্পাদক ঠিকাদার এনায়েত উল্যাহ স্বপন বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন। 

পরে ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. আবু জাহের বাদল মামলা দুটি আমলে নিয়ে এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করতে ফেনী মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

অভিযোগকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাতুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাইফুর রহমান রতন বলেন, ফেনী সদর উপজেলার দৌলতপুর-ধলিয়া এলাকায় তার দুটি সড়কের নির্মাণকাজ চলছিল। শনিবার দুপুরে ওই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

তার দাবি, দুটি সড়কের প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ টাকার কাজের বিপরীতে ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। দাবি করা টাকা না দিলে কাজ করতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমানে সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে।

রতন আরও অভিযোগ করেন, এর আগেও ফেনী শহরের এসএসকে সড়কে তাকে মারধর করা হয় এবং বড় বাজার এলাকায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময় তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের চরহুজুরী সড়কের সংস্কার কাজ শেষ করার পর মাসুদ ও তার সহযোগীরা কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন রতন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কিল-ঘুষি ও লাঠি দিয়ে মারধর করে।

অন্যদিকে স্বপন হার্ডওয়্যারের স্বত্বাধিকারী এনায়েত উল্যাহ স্বপনও কামরুল হাসান মাসুদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও মারধরের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, বিভিন্ন স্থানে ঠিকাদারি কাজের জন্য তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে মারধর করা হয়।

স্বপনের অভিযোগ, ঠিকাদারি কাজের সিডিউল কেনার সময় ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির উদ্দিনের সঙ্গেও মাসুদের বাগবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে তাকে গালাগাল, মারধরের চেষ্টা ও হাত কেটে ফেলার হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কামরুল হাসান মাসুদ। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ। এনায়েত উল্যাহ স্বপনের বিরুদ্ধে জেলা বিএনপির কাছে জায়গা-সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে এবং সেটি তদন্তের জন্য তিনজনকে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই স্বপন তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

দৌলতপুর-ধলিয়ায় গিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ প্রসঙ্গে মাসুদ বলেন, তার বাড়ি ফেনী শহরে; ধলিয়ায় গিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগই প্রমাণ করে বিষয়টি ষড়যন্ত্রমূলক।

ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, সড়কের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি ঠিকাদার সাইফুর রহমান রতন তাকে জানিয়েছেন। তিনি ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন। তবে উন্নয়নকাজে কেউ যাতে বাধা দিতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

ফেনী মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, চাঁদার দাবিতে সড়কের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দুই ঠিকাদার অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে তদন্ত করা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কামরুল হাসান মাসুদের বিরুদ্ধে এর আগেও ঠিকাদারি ও উন্নয়নকাজ ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফেনী পৌরসভার একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের চুক্তি নিয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির উদ্দিনের সঙ্গে তার বিরোধের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রকৌশলী অভিযোগ করেছিলেন, তাকে লাঞ্ছিত করা ও হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তবে মাসুদ ওই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলেছিলেন।

এদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) মাধ্যমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের জিরো পয়েন্ট থেকে মহিপাল পর্যন্ত ড্রেন পুন:নিমাণ, ফুটপাত নির্মাণ, ডাক্তারপাড়া, শিল্পকলা একাডেমি সড়ক, জয়নাল আবেদিন সড়ক ও পাঠানবাড়ি রোড উন্নয়নসহ প্রায় ২৮ কোটি টাকার একটি পাইলট প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল)। 

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, চাঁদার দাবিতে হামলা, ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের কারণে কাজ শুরু করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমি সড়কে কাজ শুরুর পর অনুমতি না নেওয়ার অভিযোগ তুলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ বন্ধ করে দেয়। একই রাতে প্রকল্পের মালামাল সংরক্ষণাগারে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। 

পরে ৩ মার্চ ডাক্তারপাড়ায় এবং ৫ এপ্রিল শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে কাজ শুরুর সময় আবারও হামলা চালিয়ে স্কেভেটর ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধর করা হয়। এ ঘটনায় ৬ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগও করা হয়। তবে হামলার সঙ্গে কারা জড়িত-এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, কার্যাদেশ স্বাক্ষরের সময় থেকেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়েছে। কামরুল হাসান মাসুদ সে ঘটনার অভ্যন্তরে কাজ করেছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিনিধি/এআরএম