Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

দুই পারে সড়ক, মাঝখানে নদী—জয়ন্তীতে সেতুর অপেক্ষায় কয়েক লাখ মানুষ

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম

এক পাশে পাকা সড়ক, অন্য পাশেও সড়ক। কিন্তু মাঝখানে বয়ে চলেছে জয়ন্তী নদী। নদীর ওপর নেই কোনো সেতু। ফলে সড়কপথে সহজে যাতায়াতের সুযোগ থাকলেও নদী পার হতে হচ্ছে নৌকা, ট্রলার কিংবা ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌযানে।

শরীয়তপুর ও বরিশাল জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নামই নেই। জয়ন্তী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি বহুদিনের। সেতুটি হলে দুই জেলার মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কমবে পথের দূরত্ব, সময় ও খরচ। গতি পাবে কৃষি, মৎস্যসহ স্থানীয় অর্থনীতি।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বরিশালের মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এবং শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার মানুষ। তাদের অনেককেই নদী পার হয়ে আবার সড়কপথে গন্তব্যে যেতে হয়। বর্ষা কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় এ যাত্রা হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জয়ন্তী নদীর মুলাদীর মৃধারহাট-ভেদুরিয়া পয়েন্টে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৪৮০ মিটার। সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।

নদী পার হয়েই গন্তব্যে

মুলাদী সদর থেকে গোসাইরহাট উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। গোসাইরহাটের আবুপুরা ঘাট থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত রয়েছে পাকা সড়ক। অন্যদিকে জয়ন্তী নদীর অপর পাড়ের মৃধারহাট ঘাট থেকে মুলাদী উপজেলা সদর হয়ে বরিশালের দিকে রয়েছে পাকা সড়ক। মাঝখানে প্রায় দুই কিলোমিটার নদীপথই যেন পুরো যোগাযোগব্যবস্থার বড় বাধা।

স্থানীয়রা বলেন, নদীর দুই পারে সড়ক থাকার পরও একটি সেতুর অভাবে সেই সড়কের পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না তারা। নৌযানে নদী পার হয়ে তারপর সড়কপথে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।

মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের অনেক মানুষ ঢাকায় যাতায়াতের সময় গোসাইরহাট-শরীয়তপুর হয়ে ঢাকার পথ ব্যবহার করেন। তাদের কেউ ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদী পার হয়ে গোসাইরহাটে আসেন। এরপর অটোরিকশা কিংবা অন্য যানবাহনে শরীয়তপুর শহরে গিয়ে ঢাকাগামী বাসে ওঠেন। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বাড়ে। একই সঙ্গে যোগ হয় নদী পারাপারের ঝুঁকি।

‘বাড়ির কাছে এসে আবার নৌকায়’

মুলাদীর তালুকদারহাট এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী। পাঁচ বছর পর গত ২১ আগস্ট দেশে ফেরেন তিনি। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে আবুপুরা ঘাটে এসে ভাইয়ের সঙ্গে নৌকায় করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, সারা পথ উড়োজাহাজ ও গাড়িতে করে এলাম। বাড়ির কাছে এসে আবার নৌকায় নদী পার হতে হচ্ছে। নদীর দুই প্রান্তেই সড়ক আছে, কিন্তু সেতু না থাকায় আমরা এই সড়কপথের সুফল পাচ্ছি না। একটি সেতু এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতি বদলে দিতে পারে।

তার মতো বহু মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতেই জয়ন্তী নদী হয়ে উঠেছে অনিবার্য এক বাধা।

একসময় চলত ফেরি

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে ২০১৫ সালে আবুপুরা-মৃধারহাট নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। তখন বরিশাল শহর থেকে মৃধারহাট এবং শরীয়তপুর শহর থেকে আবুপুরা পর্যন্ত বাস চলাচলও শুরু হয়। কিন্তু দুই বছর পর ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বাস চলাচলও। এরপর থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলারই হয়ে ওঠে নদী পারাপারের প্রধান ভরসা।

গত ২১ আগস্ট গোসাইরহাটের আবুপুরা এবং মুলাদীর ভেদুরিয়া ও মৃধারহাট ঘাট এলাকায় দেখা যায়, ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে মানুষ নৌযানে জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদী পার হচ্ছেন। যাত্রীদের মধ্যে অসুস্থ রোগীও ছিলেন।

এদিকে বর্ষাকালে নদীতে স্রোত বাড়লে এবং আবহাওয়া খারাপ হলে এই পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কমবে ৩৫ কিলোমিটার পথ

এলজিইডি মুলাদী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জয়ন্তী নদীর ওপর সেতুটি নির্মিত হলে শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে বরিশাল জেলা শহরের দূরত্ব কমবে প্রায় ১০ কিলোমিটার।

শরীয়তপুর শহর থেকে মুলাদী উপজেলা শহরের দূরত্ব কমবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। গোসাইরহাট সদর থেকে বরিশাল সদরের দূরত্ব কমবে প্রায় ৩০ কিলোমিটার। মুলাদী সদর থেকে শরীয়তপুর সদরের দূরত্বও কমবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। একই সঙ্গে বরিশাল থেকে ঢাকার সড়কপথের দূরত্ব কমবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার।

অর্থাৎ একটি সেতু শুধু নদীর দুই পাড়কে যুক্ত করবে না, বদলে দিতে পারে এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের চিত্র।

কৃষিপণ্য নিয়ে নতুন সম্ভাবনা

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় স্থানীয় কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। মুলাদীর ভেদুরিয়া এলাকার কৃষক আবদুর রহমান বলেন, জমিতে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি অনেক সময় স্থানীয় বাজারেই কম দামে বিক্রি করতে হয়।

তার আশা, সেতু নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। তখন কৃষকেরা সরাসরি দূরের বাজারে কৃষিপণ্য পাঠানোর সুযোগ পাবেন এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার বড় একটি অংশ কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। নদীঘেরা জনপদ হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাত করা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও শরীয়তপুর জজকোর্টের আইনজীবী নুরুজ্জামান শিপন বলেন, বরিশাল ও শরীয়তপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলা নদীবেষ্টিত। এখানকার মানুষের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নৌপথের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। সেতুটি নির্মাণ হলে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিও আরও গতিশীল হতে পারে।

মন্ত্রণালয়ে সেতুর প্রস্তাব

এলজিইডির বরিশাল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জয়ন্তী নদীর মুলাদীর মৃধারহাট-ভেদুরিয়া পয়েন্টে সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৮০ মিটার এবং সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।

এলজিইডির মুলাদী উপজেলা প্রকৌশলী মো. জিয়াউল হক বলেন, ছোট একটি সেতুর অভাবে বরিশালের তিনটি উপজেলা ও শরীয়তপুরের একটি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছেন। জয়ন্তী নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য তারা চেষ্টা করছেন। সেতু নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তা উপস্থাপন করা হবে।

নদী, নৌকা আর ঘুরপথের এই বাস্তবতা যেন জয়ন্তী পাড়ের মানুষের নিত্যসঙ্গী। অথচ দুই পাড়েই রয়েছে সড়ক। মাঝখানে শুধু একটি সেতুর অপেক্ষা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়িত হলে জয়ন্তী নদীর ওপর নির্মিত সেই সেতু শুধু দুই জেলার মানুষকে কাছাকাছি আনবে না, বরং যোগাযোগ, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের জীবনযাত্রায়ও তৈরি করবে নতুন সম্ভাবনা। মানুষের চলাচলের পথ সহজ করা যে উন্নয়নের অন্যতম বড় দায়িত্ব—এই সেতু যেন তারই একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিনিধি/এআরএম