২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম
দক্ষিণাঞ্চলের নদী-নালার জাল বিছানো আঁকাবাঁকা খালের ভেতর দিয়ে ভোরে যখন কুয়াশার চাদর সরতে শুরু করে, তখনই বৈঠাকাটা বেলুয়া নদীর বুকে বেজে ওঠে কর্মচাঞ্চল্যের সুর।
চারপাশ ঘিরে শত শত কাঠের নৌকা। কোনোটিতে তাজা সবজি, কোনোটিতে বিভিন্ন ধরনের ফল, আবার কোনোটিতে তাজা মাছ ও দৈনন্দিন গৃহস্থালি সামগ্রী। ডাঙ্গা নয়, হাট বসেছে সোজা জলের বুকে!
পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের এই ‘বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার’ কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং রূপসী বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের এক জ্যান্ত প্রতিচ্ছবি।
শতবছরের পথচলা যেভাবে শুরু হলো জলের হাট: বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারের ইতিহাস প্রায় শত বছরের পুরোনো। পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশালের সীমান্তবর্তী এই এলাকাটি পলিগঠিত ও নিচু হওয়ায় ঐতিহাসিক ভাবেই কৃষি প্রধান। আশপাশের গ্রামগুলোতে যেমন মনোহরপুর, বিশারকান্দি, মুগোঝোর ,কাশ্মীর, বিলডুমরিয়া, পদ্মডুবি, বলদিয়াসহ বিস্তৃন এলাকা জুড়ে বিপুল পরিমাণে সবজি ও ফসল উৎপাদিত হতো।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন স্থলপথে যোগাযোগের সুব্যবস্থা ছিল না, তখন স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল নৌকায় তুলে বেলুয়া নদীর সংযোগস্থলে এসে একত্রিত হতেন। ধীরে ধীরে এই জলজ সমাগমটিই স্থায়ী হাটের রূপ নেয়। হাটে বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয়েই নৌকায় ভেসে কেনাবেচা করেন বলে এর নাম হয় ‘ভাসমান বাজার’। সপ্তাহের নির্ধারিত দিনগুলোতে নদীর বুকে ছোট-বড় শত শত নৌকার মেলবন্ধন যেন এক অচেনা জলজ শহরের রূপ নেয়।
বর্তমান দৃশ্যপট অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ও পাইকারি কেনাবেচা: বর্তমানে বৈঠাকাটা বাজার দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ভাসমান কৃষিপণ্যের পাইকারি কেন্দ্র। সপ্তাহের প্রতি শনি ও রবিবারে ভোর থেকেই জমে ওঠে এই হাট।
পণ্যসামগ্রী: হাটে প্রধানত বিক্রি হয় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত টাটকা সবজি (লাউ, মিষ্টি কুমড়া, শসা, বেগুন, চালকুমড়া), কলাই, বিভিন্ন জাতের কচু, শাপলা, পেয়ারা, আমড়া এবং নানা পদের দেশি মাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির চারা।
বেচাকেনার মাধ্যম: স্থানীয় কৃষকরা তাদের খেত থেকে সরাসরি তোলা পণ্য ছোট নৌকায় নিয়ে আসেন। ঢাকার পাইকার এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা বড় ট্রলার বা ট্রাকে করে পরিবহনের উদ্দেশ্যে এখান থেকে পণ্য কিনে নেন।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব: কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া কৃষকরা সরাসরি তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন বলে তারা ন্যায্য মূল্য পান। প্রতি হাটের দিনে এখানে প্রায় কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
পর্যটন সম্ভাবনা জলজ বাংলার বুকে এক টুকরো ভেনিস: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভীমরুলীর পেয়ারা বাজারের পাশাপাশি বৈঠাকাটা তার নিজস্ব বৈচিত্র্য ও শান্ত পরিবেশের জন্য ভ্রমণপিয়াসী মানুষের মন কেড়েছে।
পর্যটকদের জন্য আকর্ষণ: ডিঙ্গি নৌকা বা ট্রলারে চড়ে খালের দু'পাশের সবুজ প্রকৃতি আর ব্যস্ত ভাসমান হাটের দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করার সুযোগ। বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি সংলগ্ন নদী ধরে ঘুরে দেখলে চোখে পড়ে দক্ষিণ বাংলার মানুষের চিরচেনা নদীকেন্দ্রিক জীবনধারা। ভরা মৌসুমে একদম খেত ও গাছ থেকে সদ্য তোলা পেয়ারা, আমড়া ও শসা কেনার দারুণ সুযোগ।
সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা: স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সঠিক সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বৈঠাকাটা আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে। পর্যটকদের জন্য উন্নত ওয়াশরুম, বিশ্রামাগার, সুপেয় পানি এবং নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নদীপথে লঞ্চে পিরোজপুরের নেছারাবাদ গিয়ে সেখান থেকে নদী পথে বা ঢাকা থেকে সড়ক পথে নাজিরপুর উপজেলা সদও নেমে। নাজিরপুর সদর থেকে ইজিবাইক বা মোটরবাইকে বৈঠাকাটা বাজারে যাওয়া যায়। এ ছাড়া বরিশাল থেকেও সড়কপথে নাজিরপুর হয়ে পৌঁছানো সম্ভব।
সঠিক সময়: ভাসমান বাজারের আসল রূপ দেখতে হলে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে পৌঁছাতে হবে। ভ্রমণের জন্য বর্ষাকাল (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) এবং শীতের শুরু সেরা সময়।
নদীর পলি আর কৃষকের ঘামে টিকে থাকা এই বৈঠাকাটা কেবল ঐতিহ্য নয়, এটি বাংলার আবহমান রূপ ও মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক অনন্য স্মারক। প্রযুক্তি আর আধুনিকতার ভিড়ে জলের বুকে বেঁচে থাকা এই রূপসী বাংলাকে চোখের সামনে দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসছেন শত শত পথিক।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপ-পরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, কৃষিপণ্য ছাড়াও এ ভাসমান বাজারটি দিন দিন দেশী-বিদেশী পর্যটক এর কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বেলুয়া নদীর এ ভাসমান বাজার এগ্রো ইকো ট্যুরিজম হিসেবে ঘোষণা করা যায় কিনা তা নিয়ে জেলা কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সাথে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
এআরএম