জেলা প্রতিনিধি
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ পিএম
একসময় মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে কেনা ১০টি ছোট্ট রঙিন মাছই ছিল তার ‘খামার প্রকল্প’। মাছগুলোর নামও জানতেন না তখন। বালতিতে পানি ভরে শখের বশে পালন করতেন। অথচ সেই ছোট্ট শখই ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে তার জীবনের গল্প। চার বছর পর বাড়ির উঠানে এখন সারি সারি পাকা চৌবাচ্চা। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা রঙ ও আকৃতির প্রায় ৪০ হাজার মাছ। সেই শখ আজ পরিণত হয়েছে লাখ টাকার খামারে। এই খামারের তরুণ উদ্যোক্তা আবু রায়হানের (৩০) বাড়ি নীলফামারী সদর উপজেলার রামগঞ্জ বাজারে।
বাড়ির উঠানে তৈরি করা ৩৬টি পাকা চৌবাচ্চায় বর্তমানে প্রায় ৩০ প্রজাতির রঙিন মাছ চাষ করছেন তিনি। ছোট পরিসরে শুরু করা এই উদ্যোগে পরিণত হয়েছে মহীরুহে। তার সংগ্রহে থাকা মাছের আনুমানিক বাজারমূল্য এখন প্রায় ৫ লাখ টাকা।
২০২০ সালের শুরুতে করোনা মহামারির সময় নীলফামারী শহরের একটি অ্যাকোয়ারিয়াম ফিশের দোকান থেকে শখের বসে ৫০০ টাকা দিয়ে ১০টি রঙিন মাছ কিনেছিলেন রায়হান। তখন মাছগুলোর প্রজাতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। পরে জানতে পারেন, মাছগুলো মিক্সগাপ্পি প্রজাতির।
শুরুতে বালতিতে মাছগুলো পালন করতেন। প্রায় ১৫ দিন পর পানি পরিবর্তনের সময় কয়েকটি মাছের পেটে ডিম দেখতে পান। এরপর সেই মাছ থেকেই পোনা উৎপাদন শুরু হলে রায়হানের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে মাছের সংখ্যাও।
একসময় বালতি আর ছোট পাত্রে জায়গা হচ্ছিল না। বাড়ির উঠানে একের পর এক চৌবাচ্চা তৈরি করেন তিনি। মাছের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে নতুন প্রজাতি সংগ্রহের আগ্রহ। এভাবেই শখের ছোট্ট উদ্যোগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাণিজ্যিক খামারে।
রায়হান বলেন, মাছগুলো নিয়মিত বাচ্চা দিতে শুরু করলে আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন রঙিন মাছের একটি খামার করার স্বপ্ন দেখি। বলতে গেলে রঙিন মাছ পালনের নেশায় পড়ে যাই। এখন আমার খামারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। এগুলো আমাকে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমার এমন কিছু করার ইচ্ছা ছিল, যেখানে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যায়। রঙিন মাছ চাষে আমি দুটোই পাচ্ছি। ব্যবসার পাশাপাশি এটি করতে তেমন কষ্টও হয় না। বৃহৎ পরিসরে শুরু করার ক্ষেত্রে পরিবারের সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছে। অনেকটা শখ ও আনন্দের মধ্য দিয়েই খামারটি পরিচালনা করছি।
রায়হানের খামারে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি চৌবাচ্চা। স্বচ্ছ পানির ভেতর ছোটাছুটি করছে নানা রঙের মাছ। কোনোটি লাল, কোনোটি নীল, কোনোটি আবার কালো-সাদা। লেজ ও শরীরের গড়নেও রয়েছে বৈচিত্র্য।
বর্তমানে তার খামারে রয়েছে মিক্সগাপ্পি, শর্টটেইল, রেডটেইল, প্লাটিনাম ডাম্বু, ইয়ার অ্যালবাইনো কই, কই টক্সিডো, ব্লু হেড সামুরাই, রেড মস্কো, স্নেক স্কিন গাপ্পি, কোবরা, ব্ল্যাক বেলুন মলি, হোয়াইট বেলুন মলি, জেবরা, গ্লো টেট্রা, মুনটেইল মলি, কই কার্প, কমেট কই ও মিকি মাউস প্লাটিসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির রঙিন মাছ।
রায়হান জানান, খামারের সেটআপ ও অবকাঠামো তৈরিতে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগ করে খামারটির পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
রঙিন মাছ বিক্রির জন্য রায়হানের রয়েছে ‘রঙিন মাছের খামার নীলফামারী’ নামে একটি ফেসবুক পেজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
নীলফামারী ও সৈয়দপুরের ব্যবসায়ীরাও তার খামার থেকে পাইকারি মাছ কিনে নিয়ে যান। প্রজাতি ও আকারভেদে প্রতিটি মাছ ১০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অক্সিজেনযুক্ত ব্যাগে মাছ পাঠিয়ে থাকেন তিনি।
বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৩০ প্রজাতির ৪০ হাজার পিস রঙিন মাছ। রায়হানের হিসাবে, এসব মাছের বাজারমূল্য আনুমানিক চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
তবে রঙিন মাছের খামার পরিচালনার পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। মাছের পাখনা ও ফুলকা পচা রোগসহ নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। কখনো কখনো উকুনের আক্রমণে মাছের শরীরে ক্ষতও তৈরি হয়।
রায়হানের অভিযোগ, এসব সমস্যা মোকাবিলায় এখনো সরকারি সহযোগিতা খুব একটা পাননি তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই লবণ, পটাশ, ফিটকিরি ও চুন ব্যবহার করে মাছের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা পেলে খামারটির পরিধি আরও বড় করার আশা তার।
নীলফামারী সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম বলেন, পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এই খাতে রায়হানের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করছেন। বিদেশেও রঙিন মাছের চাহিদা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, মাছ চাষে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি/এফএ