জেলা প্রতিনিধি
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৫ এএম
মুক্তিপণ চাইলে ১০টা ফোন দিতাম’ একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা ইশায়াতের পরিবার। কুবি শিক্ষিকা নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী একেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে ইশায়াত অপ্রিতমের অকাল মৃত্যুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ ও শিক্ষার্থীরা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মাঝেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ক্ষুব্ধ শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় ফেসবুকে আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান।
তিনি লিখেছেন, ‘শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম। নিখোঁজ অপ্রতিমকে মেরে ফেলা হয়েছে। হে আল্লাহ, বাবা-মাকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করুন।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ‘বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলের এমন মৃত্যু আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এই ঘটনায় শোকাহত। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।’
যা বলছে পুলিশ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম জানান, ‘ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের পর বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’
কুবি শিক্ষার্থী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ১৫-২০ জন সকালে বের হয়েছি ম্যামের ছেলে অপ্রতিমকে খোঁজার জন্য। তখন স্থানীয় একজন লোক বললেন যে,ম্যাজিক প্যারাডাইসের পাশে একটা বাচ্চার লাশ পাওয়া গেছে। এটা শোনার পর আমরা চার-পাঁচজন দৌড়ে গিয়ে দেখি বাচ্চাটা ম্যামের ছেলে। একটি শিয়াল ওর হাতে কামড়াচ্ছিল। এরপর আমরা সবাইকে খবর দিই।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের জিলানী জানান, ‘শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ওই এলাকায় কাজ করতে গিয়ে পাহাড়ের পাশে একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। কাছে গিয়ে শিশুটির মাথায় রক্ত দেখতে পান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বিষয়টি জানালে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে খবর দেন।’
এদিকে, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর শুক্রবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও দক্ষিণ মোড়ের বিভিন্ন দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রক্টরিয়াল টিম। ফুটেজে অপ্রতিমকে এক কিশোরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে ম্যাজিক প্যারাডাইসের দিকে যেতে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।পরে শনিবার সকালে ওই কিশোরের বাসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীকে পাঠানো হলে তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যায় বলে জানানো হয়। বিষয়টি কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িকে জানানো হলে দুপুর ১২টার দিকে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, আটক কিশোরের মোবাইলের মেসেজ চেক করে দেখা যায় যে, অপ্রতিমকে শুক্রবার বিকেলে বাইরে বের হওয়ার জন্য ওই কিশোরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল মেসেজের সূত্র ধরে পুলিশ সন্দেহভাজন ওই কিশোরকে আটক করেছে।
কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মহিবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এবং সিসিটিভি ফুটেজ ও মেসেজের সত্যতার ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে এক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা বিস্তারিত তদন্তের পর বলা সম্ভব হবে।’কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান, পিপিএম বলেন, ‘আজকের যে ঘটনাটি ঘটেছে, এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে একজন আটক আছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কে কে জড়িত, এর মোটিভ কী ছিল এবং কী উদ্দেশ্যে তাকে মেরে ফেলা হলো এসব বিষয় খতিয়ে দেখব। এটি কি শুধুই একটি আইফোন ছিল, নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় জড়িত ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হবে। প্রকৃতপক্ষে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করে পুরো বিষয়টি নিহতের বাবা-মা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হবে।’
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘লাশ উদ্ধারের পর সদর দক্ষিণ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবেন।’
প্রতিনিধি/ এজে