ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। নিখোঁজের প্রায় একদিন পর জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।
কুমিল্লায় ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী।
এরপর থেকেই তাকে খুঁজছিলেন পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজনেরা। খোঁজ না পেয়ে শুক্রবার রাতেই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।
শনিবার দুপুরে কিশোরটির রক্তাক্ত মরদেহ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল অপ্রতিমকে।
এই ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এর একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম।পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় তাদের বসবাস।
শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যায়ও না ফিরলে তাকে খুঁজতে শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা।
ঘটনা জানাজানি হলে কিশোর অপ্রতীমকে খুঁজতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ শিক্ষার্থীদের অনেকে যোগ দেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু নাঈম জানান, শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার খবর জানার পর থেকেই রাতভর তাকে খোঁজার চেষ্টা হয়েছে।
‘রাতে আমাদের ছেলারা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অন্যান্য সংগঠনের ছেলেমেয়েরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে খোঁজার চেষ্টা করছি। সারারাত ধরে আমরা দলে দলে ভাগ হয়ে খুঁজছি,’ বলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও যাচাই করা হয় বলে জানান, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম। তিনি বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার ভিডিও পর্যবেক্ষণের সময় আমরা একটি ভিডিওতে দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গেইটে অপ্রতীমকে দেখা যায়।’
শফিকুল করিম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে ক্যাপ পরা আরেকজনকেও দেখা গিয়েছিল। ‘ছেলেটি অপ্রতীমের থেকে বয়সে বড় এবং তার হাটাচলাও সন্দেহজনক মনে হয়েছে। সেখান থেকে আমরা পুলিশকে বিষয়টা জানায়,’ বলেন তিনি।
এই ঘটনায় ভিডিওতে থাকা ওই ব্যাক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। উপাচার্যের দাবি, ক্যাপ পরা ওই ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকারই বাসিন্দা।
অপ্রতিমকে খুঁজে না পেয়ে রাতেই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা হয়।
জিডি সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ থানার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে হেঁটে বের হয় অপ্রতিম।
এরপর সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পায়নি পরিবার। নিখোঁজের পর থেকে তাকে উদ্ধারে স্বজনদের পাশাপাশি পুলিশও তৎপর রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে কাজ করতে গিয়ে অপ্রতীমের মরদেহ দেখতে পানে থেকে ওই এলাকায় স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আব্দুল কাদির জ্বিলানী। তিনি জানান, আমার ভাতিজা প্রথমে জঙ্গলে একটা বাচ্চাকে পড়ে থাকতে দেখে। আমাকে বললে কাছে এসে দেখি বাচ্চাটা পড়ে আছে, মাথায় রক্ত। দেখে আমরা ভয় পেয়ে কাজ ফেলে চলে গেছি।
পরে স্থানীয় লোকজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে জানালে দুপুরের দিকে ওই জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কুমিল্লার এই ঘটনা সারাদেশেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে নানা মন্তব্য করতে দেখা গেছে অনেককেই। পুলিশ বলছে, এই ঘটনায় জড়িতদের ধরতে এরইমধ্যে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে আটক করার কথাও জানানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, প্রকৃত কারণ জানতে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কী উদ্দেশ্যে এই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে দ্রুত তা উদঘাটন করা হবে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো: আনিসুজ্জামান।
‘এটা কী শুধুই একটা আইফোন ছিল নাকি এর সাথে আরও অন্য কিছু যুক্ত ছিল এই বিষয়টি আমরা সঠিকভাবে খতিয়ে দেখব এবং প্রকৃত যারা এর সাথে জড়িত তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে,’ বলেন তিনি।
আনিসুজ্জামান বলছেন, ‘আমার একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে আছে একজন ব্যক্তি, জিজ্ঞাসাবাদ চলতেছে।’
এদিকে, এই ঘটনায় নিহতের পরিবরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। ‘আমার জীবনে যে কয়টা করুণ মৃত্যু দেখেছি তার মধ্যে এটি একটি। এই ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে আগামী তিন মাসের মধ্যে যাতে বিচারকার্য সম্পন্ন হয় আমি এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবো,’ বলেন তিনি। সূত্র: বিবিসি বাংলা
জেবি