Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

জাজিরায় পদ্মার ভাঙন আতঙ্কে ৪০০ পরিবার

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

আজ যেখানে মানুষের বসতঘর, উঠান আর ফসলের মাঠ-কাল সেখানে বইতে পারে পদ্মার স্রোত। একসময় যে পথে সকাল-বিকেল মানুষের চলাচল ছিল, সেখানে এখন কেবল নদীর গর্জন। তীব্র স্রোতের আঘাতে প্রতিদিনই ভেঙে পড়ছে পাড়। চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, দোকান ও চলাচলের সড়ক। ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন নদীপাড়ের মানুষ।

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবার আলম খাঁর কান্দী এলাকায় পদ্মা নদীতে নতুন করে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। গত কয়েক দিনে প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি বসতবাড়ি, দুটি দোকান, ফসলি জমি ও ইটের সড়কের অংশ। ভাঙন ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের প্রায় ৪০০ পরিবার এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয়দের কাছে নদীভাঙন এখন আর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। কারও ঘরের চাল খুলে নেওয়া হচ্ছে, কেউ দরজা-জানালা খুলে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। কেউবা শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।

1000152109

চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে ঠিকানা

ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার স্রোত তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে তীরে। কোথাও নদীর পাড় ধসে পড়ছে, কোথাও বসতঘর সরানোর ব্যস্ততা। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ বাঁশ-কাঠ খুলে নিচ্ছেন। কয়েকটি পরিবার ইতোমধ্যে তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গত দুই দিনে অন্তত ৩৫টি বসতঘর, গবাদিপশু ও দুটি দোকান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ভাঙন থামার কোনো লক্ষণ না থাকায় আতঙ্ক আরও বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, ‘চোখের সামনে বাড়ির পাশের মাটি নদীতে চলে যাচ্ছে। শেষ সম্বলটুকু কীভাবে বাঁচাব, সেটাই এখন চিন্তা। ঘর সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’

ইসমাইল নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘নদী কখন কোন দিক থেকে ভেঙে পড়ে, বলা যায় না। পরিবার নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।’

ঝুঁকিতে বিদ্যালয়, আশ্রয়ণ প্রকল্প ও বাজার
শুধু বসতবাড়িই নয়, ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, কলাবাগান, বালুরটেক এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা ও স্থানীয় বাজার। ভাঙন আরও বিস্তৃত হলে এসব স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তাদের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হলেও এখন পর্যন্ত তা ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়বে।

‘নির্দেশনা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’
ভাঙন পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণেই ওই এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।

1000152106

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে আমরা অবগত আছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে ভাঙনে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম জানিয়েছেন, ভাঙনের কারণে যেসব পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চাই স্থায়ী সমাধান
নদীপাড়ের মানুষের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে ভাঙন ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও চান তারা।

পদ্মার তীরে এখন প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। কখন নদীর স্রোতে হারিয়ে যাবে বসতভিটার শেষ চিহ্ন—এই শঙ্কা নিয়েই দিন পার করছেন শত শত মানুষ। যে উঠানে একসময় শিশুদের ছুটোছুটি ছিল, যে ঘরে ছিল সংসারের হাসি-কান্না, সেই ঘরই এখন সরিয়ে নিতে হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।
নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে এখানকার মানুষের জীবন যেন বারবার একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়াচ্ছে—আজ যেখানে ঘর, কাল সেখানে পদ্মা। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে থামানো হবে পদ্মার ভাঙন; রক্ষা করা হবে মানুষের বসতভিটা, জীবিকা ও শেষ আশ্রয়টুকু।

প্রতিনিধি/এমআই