Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ম্যানগ্রোভ বন ঘেঁষে স্থাপনা নির্মাণ, হুমকিতে গঙ্গামতির জীববৈচিত্র্য

উপজেলা প্রতিনিধি

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

পটুয়াখালীর কুয়াকাটার গঙ্গামতি লেকসংলগ্ন সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ঘেঁষে কাঠের স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ধুলাসার ইউনিয়নের ধোলাই মার্কেটের পশ্চিম পাশে গত চার দিন ধরে প্রকাশ্যে নির্মাণকাজ চললেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, বন ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের এত কাছে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে ওই এলাকায় আরও স্থাপনা গড়ে উঠতে পারে। এতে হুমকির মুখে পড়তে পারে গঙ্গামতির ম্যানগ্রোভ বন ও জীববৈচিত্র্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, গঙ্গামতি লেক ও একটি প্রাকৃতিক জলাশয়ের একেবারে পাশে কাঠের স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কাঠের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পাটাতন তৈরির কাজও চলছে। স্থাপনাটির আশপাশে রয়েছে কেওড়া, গেওয়া, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য গাছপালা।

পরিবেশকর্মীদের মতে, গঙ্গামতির ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মাটির ক্ষয় রোধ এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বন ও জলাশয়ের পাশে স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বাড়লে ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

18ef6488-ea91-4f57-b024-0bff99215e8a

পরিবেশকর্মীদের দাবি, কুয়াকাটা সৈকতের লেম্বুরবন-খাজুরা থেকে গঙ্গামতি হয়ে কাউয়ার চর পর্যন্ত বেড়িবাঁধের বাইরে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করে পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে বনাঞ্চলের পাশাপাশি উপকূলীয় পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্থানীয় জেলে ইদ্রিস ফরাজি বলেন, ‘আমরা সাধারণ জেলে। সাগরে মাছ শিকার করে সংসার চালাই। এই বনের আশপাশেই আমাদের চলাফেরা। এভাবে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হলে একে একে আরও অনেকে স্থাপনা করবে। একসময় বন ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে উপকূলের মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে এবং আমাদের জেলে পেশাও হুমকির মুখে পড়বে। শুনছি, এখানে রিসোর্ট ও পার্ক করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কলাপাড়া উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মেজবাহ উদ্দিন মাননু বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় জমির মালিকানা থাকলেও ইচ্ছেমতো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদফতর ও বন বিভাগের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। এখানে রিসোর্ট করার সুযোগ নেই। এ ধরনের স্থাপনা হলে স্থানীয় জনজীবনেও ব্যাপক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি উপকূলের জেলেদের আশ্রয়স্থলও সংকুচিত হয়ে যাবে।’

cb7ee94f-74fa-4c12-a74d-a92766ad5333

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, গঙ্গামতির সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের পাশে একটি স্থাপনা নির্মাণের দৃষ্টান্ত তৈরি হলে ভবিষ্যতে একই এলাকায় আরও স্থাপনা গড়ে ওঠার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে কেওড়া, গেওয়া ও অন্যান্য গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পাখি, জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে স্থাপনা নির্মাণকারী মো. মোস্তাকুর রহমান জমিটির মালিকানা দাবি করে বলেন, ‘আমি এই জমির রেকর্ডীয় মালিক। প্রায় ১৫ বছর আগে জমিটি কিনেছি। বিএস রেকর্ডেও আমি মালিক। জমিটি মেপে দেওয়ার জন্য স্থানীয় এসিল্যান্ডের কাছে আবেদন করেছি। এখানে আমি রিসোর্ট করব না, রেস্টুরেন্ট করব।’

d6975d09-38d3-4049-8614-406834a9d871

বন বিভাগের গঙ্গামতি বিট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, স্থাপনা নির্মাণের প্রথম দিনই তিনি সেখানে গিয়ে কাজ করতে বাধা দিয়েছেন। তবে তারা নিজেদের জমি দাবি করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় স্থাপনা নির্মাণে বন বিভাগ বা পরিবেশ অধিদফতরের কোনো ছাড়পত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।

কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

প্রতিনিধি/এসএস