Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

পালিত পুত্রের কাছে কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে দিয়ে নিঃস্ব বাবা

জেলা প্রতিনিধি

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

সন্তান ছিল না। তাই প্রায় ১৪ বছর আগে এক শিশুকে নিজের সন্তানের মতো করে ঘরে তুলে নিয়েছিলেন ৭০ বছর বয়সী আমিনুর রহমান। আদর-যত্নে বড় করেছেন, দিয়েছেন শিক্ষা ও সংসারের ঠিকানা। পরে সেই পালিত পুত্র রাকিবুল ইসলাম রাজুর সঙ্গে বিয়ে দেন নিজের স্ত্রীর ছোট বোনের মেয়ে শিউলি বেগমের। জীবনের শেষ সময়ে পালিত পুত্রই তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হবেন—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল আমিনুর রহমানের।

তবে সেই পালিত পুত্রের বিরুদ্ধে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তি কৌশলে লিখে নেওয়া, পরে ভরণপোষণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা এবং খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগ করেছেন আমিনুর রহমান। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়নের কলেজপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ডিমলা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

অভিযোগে রাকিবুল ইসলাম রাজু (৪২), তার স্ত্রী মোছা. শিউলি বেগম (৩২) ও শিউলির বাবা দবির উদ্দিনকে (৫৫) অভিযুক্ত করা হয়েছে।

থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে আমিনুর রহমান বলেন, তার কোনো সন্তান না থাকায় প্রায় ১৪ বছর আগে রাকিবুল ইসলাম রাজুকে পালিত পুত্র হিসেবে ঘরে তুলে নেন। পরে নিজের স্ত্রীর ছোট বোনের মেয়ে শিউলি বেগমের সঙ্গে রাকিবুলের বিয়ে দেন।

আরও পড়ুন

শরীরে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে কাতরাচ্ছে শিশু তানিয়া

আমিনুরের অভিযোগ, প্রায় ১২ বছর আগে রাকিবুল ও শিউলি পরস্পর পরামর্শ করে তাকে অচেতন করার ওষুধ খাইয়ে কৌশলে তার প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সব সম্পত্তি রাকিবুলের নামে লিখে নেন। সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর তাকে ভরণপোষণ ও দেখাশোনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে তা রাখা হয়নি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর থেকে তাকে সংসার থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঠিকমতো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয় না। বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ ও অশালীন আচরণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তার।

আমিনুর রহমান জানান, তার স্ত্রী রাহেনা খাতুন ১০ থেকে ১১ বছর আগে মারা গেছেন। সংসারে অশান্তির কারণে এরপর আর বিয়ে করেননি। বর্তমানে জীবনের শেষ সময়ে তিনি একাকী ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

aminur

তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। ২০১৬ সালে অবসর নেওয়ার পর অবসরকালীন অর্থ পারিবারিক ও সংসারের কাজে ব্যয় করেছেন। বর্তমানে তার হাতে কোনো সঞ্চয় নেই। সামান্য মাসিক অর্থ দিয়ে সংসার ও চিকিৎসার খরচ চালাতে হচ্ছে।

আমিনুর রহমান বলেন, তার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। স্ট্রোকের কারণে তাকে নিয়মিত থেরাপি নিতে হয়। প্রতি মাসে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বয়স ও স্ট্রোকজনিত কারণে তিনি ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না।

লিখিত অভিযোগে আমিনুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, গত ৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে রাকিবুল তার স্ত্রী শিউলিকে তাকে খাওয়ানোর জন্য রাখা খাবারে বিষ মিশিয়ে টেবিলে রাখতে বলেন। ওই খাবার খেলে তিনি মারা যেতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানান বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।

আমিনুর রহমান বলেন, ‘যাকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করে বড় করেছি, জীবনের শেষ সময়ে এসে তার কাছ থেকেই এমন আচরণের শিকার হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এখন আমার নিজের বলতে কিছুই নেই। চিকিৎসার খরচ চালাতেও কষ্ট হয়। এই বয়সে আমি নিরাপদে বাঁচতে চাই। একটু সুস্থতা চাই।’

অভিযোগের বিষয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছেন ডিমলা থানার উপসহকারী পুলিশ পরিদর্শক (এএসআই) শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের কথা শুনেছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গেও কথা বলেছি। বিষয়টি ওসি মহোদয়কে জানিয়েছি।’

ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, তিনি বিষয়টি জেনেছেন এবং আমিনুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাকে ও তার পালিত ছেলেকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি পারিবারিক হলেও আমিনুর রহমান অসহায় অবস্থায় প্রশাসনের কাছে এসেছেন। দ্রুতই বিষয়টি নিয়ে বসার চেষ্টা করা হবে।

প্রতিনিধি/এসএস