Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

কাহালগাঁওয়ে চর্মরোগের প্রকোপ, মুরগির খামারের বর্জ্যকে দায়ী স্থানীয়দের

জেলা প্রতিনিধি

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২ এএম

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কাহালগাঁও গ্রামে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চুলকানি ও চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামের বিভিন্ন বাণিজ্যিক মুরগির খামার ও খামারের বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে কাহালগাঁও গ্রামের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেকেই শরীরে চুলকানির সমস্যায় ভুগছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ চিকিৎসার পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি বলে জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাহালগাঁও গ্রামে চার-পাঁচটি বাণিজ্যিক মুরগির খামার রয়েছে। এর মধ্যে সিপি বাংলাদেশ নামের একটি বয়লার মুরগির খামার থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ১৫-২০টি ট্রাকে মুরগির বিষ্ঠা পরিবহন করা হয়। এসব ট্রাকে ঢাকনা না থাকায় বর্জ্য বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরিবহনের সময় গ্রামের সড়কেও পড়ে থাকছে।

7a4cda91-0465-48dc-96b0-a9a8fe418b87

মুরগির বিষ্ঠা পরিবহনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে ফুলবাড়ীয়া উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাইয়ুমের নামও স্থানীয়রা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে মুঠোফোনে কথা না বলে সরাসরি দেখা করে বক্তব্য দেবেন বলে জানান।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এনায়েতপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজায় ২ হাজার ৮৮৩ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। কাগজপত্রে ৩০০ একর গজারি বনের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। সংরক্ষিত বনের সবচেয়ে বেশি জমি কাহালগাঁও গ্রামে। বন বিভাগের ভাষ্য, এসব জমির বড় অংশই জবরদখল হয়ে গেছে।

এনায়েতপুর বিট কর্মকর্তা সেলিম মিয়া বলেন, বনের জমিতে ১০-১২টি বাণিজ্যিক মুরগির খামার গড়ে উঠেছে। এগুলো নির্মাণ বন্ধে বন বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে প্রভাবশালীদের কারণে তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তার ভাষ্য, এসব খামারের কারণে বন এলাকার পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে।

8c209a39-f5a4-484a-94b3-42085467acd0

এনায়েতপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে কাহালগাঁও গ্রাম। সেখানে প্রায় ৮-৯ হাজার ভোটার এবং প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসবাস।

কাহালগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকিকুন নেছা বলেন, শিক্ষার্থীরা চুলকানির রোগে আক্রান্ত কি না, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বায়োজিদ ও পবিত্র জানায়, প্রায় তিন মাস ধরে তাদের শরীরে চুলকানি হচ্ছে।

কাহালগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফজলুল করিম বলেন, একসময় গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ মনোরম ছিল। বর্তমানে বাণিজ্যিক মুরগির খামারের কারণে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং মশা-মাছির উপদ্রবও বেড়েছে। মুরগির বিষ্ঠার ব্যবসা নিয়মের মধ্যে না আনা হলে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

262713f7-6221-424b-9cd5-7646bcdf5e15

কাহালগাঁও ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা পরিদর্শনে দেখা যায়, অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী চুলকানির সমস্যায় ভুগছেন। তারা অবাধে গড়ে ওঠা মুরগির খামার এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মুরগির বিষ্ঠা পরিবহনকে এর জন্য দায়ী করেন।

কামারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চুলকানির সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়ার হাতে চুলকানি বেড়ে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে সে বিদ্যালয়ে আসছে না।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নায়ার সুলতানাও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তার বাড়ির পাশেই একটি বাণিজ্যিক মুরগির খামার রয়েছে। তিনি বলেন, দুর্গন্ধের কারণে বাড়িতে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। রাত ১০টার পর খোলা ট্রাকে মুরগির বিষ্ঠা পরিবহন শুরু হলে দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, চুলকানির কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে রোগটি আরও শিক্ষার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন

শরীরে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে কাতরাচ্ছে শিশু তানিয়া

কাহালগাঁওয়ের ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরাও চুলকানির সমস্যায় আক্রান্ত। চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ করেও তারা পুরোপুরি সুস্থ হননি। তার অভিযোগ, বাণিজ্যিক মুরগির খামারে বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের মধ্যে চুলকানি ছড়িয়ে পড়ছে। মুরগির বিষ্ঠা পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলেও তিনি দাবি করেন।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হারুন আল মাকসুদ বলেন, সম্প্রতি চুলকানির সমস্যা নিয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। কেন এমন হচ্ছে, তা জানতে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক। সেখানে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখা হবে।’

প্রতিনিধি/এসএস