জেলা প্রতিনিধি
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০ এএম
কুমিল্লা নগরীর মুরাদপুর এলাকায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৭৭ বছরের পুরোনো জানু মিয়া জামে মসজিদ। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, টেরাকোটার কারুকাজ ও ঐতিহাসিক নানা স্মৃতি ধারণ করে থাকা এই মসজিদ এখনো স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করে।
১৮৪৯ সালে খান বাহাদুর আশরাফ আলী ‘আশরাফিয়া জামে মসজিদ’ নামে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন এ এলাকার জমিদার। পরবর্তী সময়ে তার নাতি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের সহচর জানে আলম চৌধুরী, যিনি জানু মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন, তার নামেই মসজিদটি পরিচিতি পায়।

তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির মূল আয়তন ছিল প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট। মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৯০ সালে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এর আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট। একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।
প্রফেসর আমীর আলী চৌধুরীর লেখায় মসজিদটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, খান বাহাদুর আশরাফ আলী দিল্লি থেকে কারিগর এনে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের ভেতরের বিভিন্ন নকশাও দিল্লির কারিগরেরা তৈরি করেন।

প্রথমে প্রতিষ্ঠাতার ছেলে আরবে রহমান মসজিদটির মোতাওয়াল্লি ছিলেন। তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত মসজিদটি তার নামেই পরিচিত ছিল। পরে তার ছেলে জানু মিয়া মোতাওয়াল্লি হলে মসজিদটি জানু মিয়া মসজিদ নামে পরিচিতি পায়। জানু মিয়ার সংগীত ও সাহিত্যচর্চার কারণে এই নামই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
জানে আলম চৌধুরীর সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শচীন দেববর্মণের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তার বাসভবনে সংগীতের আসর বসত। কবি নজরুল ইসলামও দুবার ওই বাড়িতে এসেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। মসজিদের পাশেই রয়েছে জানে আলমের সেই বাসভবন।

সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের ভেতরে কষ্টিপাথরে ফার্সি ভাষায় প্রতিষ্ঠাতার নাম ও নির্মাণসন লিপিবদ্ধ রয়েছে। দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকাজ এখনো দৃষ্টিনন্দন। চুন ও পাথর দিয়ে নির্মিত মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীতে প্রাচীন নির্মাণরীতির ছাপ স্পষ্ট।
মসজিদটির মেহরাবও ব্যতিক্রমী। সাধারণত মসজিদের মেহরাব বাইরের দিকে কিছুটা বেরিয়ে থাকে। কিন্তু এই মসজিদের মেহরাব ভেতরের দিকে। এর কারণ হিসেবে মসজিদের প্রায় ৫৬ ইঞ্চি পুরু দেয়ালের কথা উল্লেখ করা হয়।

মসজিদটিতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ, চারটি মিনার এবং ৩৬ ধরনের নকশা। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এই নিদর্শন এখনো এর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। স্থানীয় মুসল্লিদের কাছে এখানে নামাজ আদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলাদা এক প্রশান্তির অনুভূতি।
নগর ইতিহাসবিদ আহসানুল কবির বলেন, জানে আলম ছিলেন তৎকালীন সময়ের একনিষ্ঠ সংগীতসাধক। মসজিদের পাশে তার বাসভবন ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম, শচীন দেববর্মণসহ উপমহাদেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা তার বাসভবনে আসতেন এবং সেখানে গানের আসর বসত। এ কারণে ওই এলাকায় বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা ছিল। একসময় ‘আশরাফিয়া জামে মসজিদ’ও জানু মিয়া মসজিদ নামে পরিচিতি পায়।
প্রতিনিধি/এসএস