জেলা প্রতিনিধি
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
জীবনযুদ্ধে মানুষ অনেক সময় দারিদ্র্যের কাছে হেরে যায়। আবার কখনো দারিদ্র্যকে জয় করে ভালোবাসা। শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের সাজু শেখ (৮৬) ও নুরজাহানের (৮০) জীবনের গল্প যেন তেমনই। দীর্ঘ ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে দারিদ্র্য, শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্য তাদের ভালোবাসাকে হারাতে পারেনি।
প্রায় ৭০ বছর আগে বিয়ে হয় সাজু শেখ ও নুরজাহানের। বিয়ের পর থেকে সাজু শেখের পৈতৃক ভিটায় বসবাস করছেন তারা। আর্থিক অনটনের সংসারে সাজু শেখ কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও ছয় সন্তান—তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে বড় করেছেন তারা।
তিন মেয়েরই অনেক আগে বিয়ে হয়েছে। তাদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে বাবার খোঁজ নেন। তিন ছেলের একজন করোনার সময় নিখোঁজ হলেও মাঝে মাঝে খোঁজখবর রাখেন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান। তিনিও বছরে দু-একবার বাড়িতে আসেন।
শেরপুরে থাকা ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি সাধ্যমতো মা-বাবার খোঁজখবর রাখেন। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে তার নিজের সংসারেও টানাটানি। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে মা-বাবার ভরণপোষণও ঠিকমতো করতে পারেন না তিনি।
প্রায় পাঁচ বছর আগে পা পিছলে পড়ে নুরজাহানের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। এরপর থেকে তিনি শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা করাতে পারেননি স্বামী সাজু শেখ। একই কারণে অসহায় ছেলে নূর ইসলামও।
তবে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় এতটুকু ঘাটতি পড়েনি সাজু শেখের। অসুস্থতা ও বয়সের ভারে নিজেই নুয়ে পড়লেও স্ত্রীকে এক মুহূর্তের জন্য একা ছেড়ে যাননি। বয়সের কারণে নুরজাহান এখন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। আর সাজু শেখও ঠিকমতো সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। বার্ধক্যের কারণে কানে কম শোনেন। জোরে কথা না বললে কারও কথা বুঝতে পারেন না।
তারপরও দিনরাত স্ত্রীর পাশে থাকেন সাজু শেখ। নুরজাহান শয্যাশায়ী হওয়ার পর প্রতিদিন সকালে তাকে কোলে করে ঘরের দরজার বাইরের উঠানে চটি বিছিয়ে শুইয়ে দেন। এরপর পাশে বসে সময় কাটান। ফিরে যান তাদের হারিয়ে যাওয়া কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতিতে।
কানে কম শুনলেও স্ত্রীর ইশারা বুঝতে পারেন সাজু শেখ। প্রস্রাব-পায়খানাসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনের সব কাজে কাঁপা হাতে স্ত্রীকে সহযোগিতা করেন তিনি। ভাঙা শরীর নিয়েও স্ত্রীর সেবা করে চলেছেন ৮৬ বছরের এই বৃদ্ধ।
স্থানীয়রা জানান, সংসারের খরচ জোগাতে মাঝেমধ্যে বাড়ির পাশের খুনুয়া বাজারে কাজের সন্ধানে যান সাজু শেখ। কিন্তু কঙ্কালসার শরীর দেখে তাকে কাজ দিতে চান না কেউ। তাই বাজার ঘুরে কিছুক্ষণ পরই আবার স্ত্রীর কাছে ফিরে আসেন তিনি।
মাঝেমধ্যে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করেন, ‘আমাদের দুজনকে একসঙ্গে নিয়ে যাও, আল্লাহ।’
সম্প্রতি ঘরের দরজার বাইরে স্ত্রীকে কোলে নিয়ে এমনই কষ্টের কথা বলছিলেন সাজু শেখ। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আল্লাহ, আমাকে খাবার দাও। আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
তাদের এই অসহায়ত্বের দৃশ্য ধারণ করে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে আসে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের।
এরপর তিনি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসানকে ওই দম্পতির বাড়িতে পাঠান। তারা দুই মাসের খাদ্যসামগ্রী, বৃদ্ধ দম্পতির পরনের কাপড়, কম্বল ও নগদ অর্থ দিয়ে আসেন।
একই সঙ্গে তাদের প্রতি মাসের খাবারের দায়িত্ব নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক। তিনি বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে নূর ইসলামকে প্রতি মাসে তার কার্যালয়ে গিয়ে মা-বাবার জন্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে বলেন। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ফেসবুকে ভিডিওটি দেখে শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্ত সৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি/এআর