Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

নড়বড়ে ঝুলন্ত সেতুই ভরসা, ঝুঁকিতে ১০ গ্রামের মানুষ

জেলা প্রতিনিধি

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দলিয়া খালের ওপর একটি নড়বড়ে ঝুলন্ত সেতু দিয়ে বছরের পর বছর পারাপার করছেন বরঝালা, মোহাম্মদপুর, রসলপুর, আখবাড়ি, তৈইকাতাং, ছনখোলাপাড়া, দলধলী, আটবাড়ি ও মিস্ত্রিপাড়াসহ ১০ গ্রামের মানুষ। বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতু দিয়েই তাদের চলাচল করতে হয়। সেতু থেকে পড়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে।

স্থানীয়রা জানান, ওই এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি মসজিদ, একটি বৌদ্ধমন্দির, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এবং ফলদ ও বনজ বাগান রয়েছে। এ ছাড়া যাতায়াতের জন্য পাকা সড়কও নেই। দলিয়া খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় হাজার হাজার পাহাড়ি-বাঙালি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নড়বড়ে ঝুলন্ত সেতুটিই বর্তমানে দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। দলিয়া খালের দুই পাড় ভেঙে সেতুর খুঁটির নিচের মাটি ধসে পড়েছে। ঝুঁকি নিয়ে মানুষ সেতুটি পারাপার করছে। যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ১০ গ্রামের মানুষ।

image

পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. উজ্জ্বল মোল্লা বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে চলাচল করছি। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলে সেতু ভেসে যায়। তখন পারাপার বন্ধ হয়ে যায়।’

বলিপাড়ার চায়ের দোকানি লেন্দু চাকমা বলেন, ‘অন্য গ্রাম থেকে মানুষ বেড়াতে এলে এই ঝুলন্ত সেতু দিয়ে পার হতে না পেরে অনেকে ঘুরে চলে যান। রাতে কেউ অসুস্থ হলে দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।’

আখবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সুমিতা চাকমা ও লিপি চাকমা বলেন, ‘গাড়ি চলাচল করে না। রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুব্যবস্থা নেই। আমাদের ছেলে-মেয়েদের ঝুঁকিপূর্ণ ঝুলন্ত সেতু দিয়ে স্কুলে পাঠাতে ভয় হয়। শিক্ষার্থীরা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত চিন্তায় থাকি।’

বরঝালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেরাজ হোসেন ভাই-বোন। তারা জানায়, ‘সেতুর ওপর দিয়ে হাঁটলে সেতুটি দুলতে থাকে। আমাদের ভয় হয়। বেশি বৃষ্টি হলে খালের পানি বেড়ে গেলে আমরা আর স্কুলে যেতে পারি না। একটি পাকা সেতু করে দিলে আমাদের জন্য ভালো হবে।’

সেতুর অভাবে কৃষকেরা উৎপাদিত কৃষিপণ্য সময়মতো খাগড়াছড়ি বা মাটিরাঙ্গা বাজারে নিতে পারেন না। ফলে অনেক পণ্য খালের ওপারেই নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক সময় রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সেতু নির্মাণ হয়নি। বড়ঝলা, মোহাম্মদপুর, মিস্ত্রিপাড়াসহ আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষ প্রতিনিয়ত এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

image

ঝুঁকিপূর্ণ নড়বড়ে সেতুর কারণে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে দলিয়া খালের ওপর একটি টেকসই স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দ্রুত সেতুটি নির্মাণের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে—এমন প্রত্যাশা তাদের।

বরজালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রহিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে হয়। সেতুর ওপারের ১২ জন শিক্ষার্থী স্কুলে আসে। ভয়ে তারা স্কুলে আসতে চায় না। আমরা অভিভাবকদের বলি, আমরা সঙ্গে নিয়ে যাব। তারপরও অভিভাবকেরা সন্তানদের পাঠান না। একটি সেতু না থাকায় সারাক্ষণ দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকতে হয়। এ কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীও বাড়ছে না।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ এই ঝুলন্ত সেতু পার হতে গিয়ে স্কুলের এক ম্যাডাম সেতুর কাঠের পাটাতন ভেঙে নিচে পড়ে হাত-পা ভেঙে ফেলেন। খালের পানি বেড়ে গেলে বিকল্প ভেলায় পার হতে গিয়েও ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটেছে।’

মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে তাহমিনা মিতু বলেন, ‘দলিয়া খালের ওপর ঝুলন্ত সেতু দিয়ে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। খালের ওপারের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হবে।’

প্রতিনিধি/এআর