জেলা প্রতিনিধি
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২০ পিএম
নরমাল ডেলিভারি করানোর আশ্বাস দিয়ে এক গর্ভবতী নারীকে রাতভর হাসপাতালে রেখে দেওয়ার পর অগ্রিম ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসা শুরু হলেও ততক্ষণে গর্ভের শিশু মারা যায় বলে অভিযোগ করেছেন ওই নারীর স্বজনেরা। পরে ভোররাতে রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়। কক্সবাজার সদরের লিংকরোডের মহুরীপাড়ায় ‘হ্যাপি মাদার কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৬ আগস্ট রাতে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সারজিনা আক্তার। তিনি উখিয়ার রাজাপালং এলাকার ইফতেখারের স্ত্রী।
গর্ভের সন্তান হারিয়ে সারজিনা এখন অনেকটাই বাকরুদ্ধ। তার অভিযোগ, ১০ হাজার টাকা অগ্রিম না পাওয়ায় তার চিকিৎসায় বিলম্ব করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসা দেওয়া হলে সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব ছিল বলে দাবি তাঁর।
সারজিনা বলেন, তিনি আগে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেখান থেকে নরমাল ডেলিভারি করানোর আশ্বাস দিয়ে হ্যাপি মাদার কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপী তার স্বামীকে ফোন করে তাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান।
সারজিনার ভাষ্য, হাসপাতালে যাওয়ার পর তাকে জানানো হয়, আগে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হবে, এরপর চিকিৎসা শুরু হবে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার টাকার বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। হাসপাতালের পরিবেশ দেখে তারা চলে যেতে চাইলে পরিচালক হ্যাপী ও তার সিনিয়র সহকর্মী সেলিনা তাদের বুঝিয়ে হাসপাতালে রেখে দেন। পরে চলে যেতে চাইলেও পরীক্ষার প্রতিবেদন দিতে গড়িমসি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সারজিনা বলেন, রাত ১২টার দিকে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়ার পর চিকিৎসা শুরু হয়। রাত ২টার দিকে প্রসবব্যথা শুরু হলে পরীক্ষা করে শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়ার কথা জানানো হয়। একপর্যায়ে পেট শক্ত হয়ে যায় এবং শিশুর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপরও হ্যাপী তাকে নরমাল ডেলিভারি করানোর আশ্বাস দিতে থাকেন।
তিনি বলেন, রাত সাড়ে ৩টার দিকে হ্যাপী এসে জানান, সিজার করতে হবে এবং অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এ সময় অক্সিজেন ও সিলিন্ডারের টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাকে যেতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সারজিনা। পরে টাকা দিতে না পারায় হাসপাতালের পরিচালক তার মোবাইল ফোন রেখে দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পরে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে সারজিনাকে কক্সবাজার ডিজিটাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সারজিনার দাবি, সেখানে চিকিৎসক তাকে জানান, তার গর্ভের সন্তান অন্তত চার ঘণ্টা আগেই মারা গেছে।
কক্সবাজার ডিজিটাল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আরেফা মেহের রুমী বলেন, ভোর ৫টার দিকে রোগীকে তাদের হাসপাতালে আনা হয়। তখন তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল এবং রক্তচাপও বেড়ে গিয়েছিল। পরীক্ষায় শিশুর হার্টবিট পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, রোগীকে তাৎক্ষণিক জরুরি সিজার করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় দেখা যায়, শিশুটি পেটে পায়খানা করে দিয়েছে এবং মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে আনার অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আগে শিশুটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

রোগীর স্বজন মোহাম্মদ আলাউদ্দিন অভিযোগ করেন, সেদিন তাদের কাছে মনে হয়েছে, রোগীর চিকিৎসার চেয়ে টাকা আদায়কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দাবিকৃত টাকা দিতে দেরি হওয়ায় রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। ১০ হাজার টাকা নেওয়ার পর নামমাত্র চিকিৎসা শুরু করা হয়। নরমাল ডেলিভারি করানোর কথা বলে সারারাত অপেক্ষা করিয়ে ভোররাতে সিজার করতে হবে জানিয়ে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। ততক্ষণে গর্ভের সন্তান মারা যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আলাউদ্দিন বলেন, ঘটনার বিষয়ে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, হ্যাপি মাদার কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি বাহ্যিক চাকচিক্য ও বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রচারণার মাধ্যমে রোগী আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মানুষকে নরমাল ডেলিভারির আশ্বাস দিয়ে সেখানে নেওয়া হয়। পরে টাকা আদায় করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে তাদের অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রসবসংক্রান্ত চিকিৎসা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো রোগীর জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে এমন প্রতিষ্ঠানে রোগী রাখা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হ্যাপি মাদার কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপী বলেন, ‘আমি এ-সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাই না। আমি শুধু সিভিল সার্জনকে বলব।’
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ‘এটা কারা করছেন, বিষয়টি আমরা খোঁজ নিচ্ছি। ভুক্তভোগীর অভিযোগ পেলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হয়। এ ব্যাপারে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তারের সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
প্রতিনিধি/এসএস